ঘরভাড়া দেওয়ার টাকা জোগাড় করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া বাগেরহাটের রামপালের অসহায় নারী রেহানা খাতুনের পাশে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। তার জন্য সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরের ব্যবস্থা, খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তামান্না ফেরদৌস এবং বাগেরহাট-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ ও বন প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) অপু রায়হানসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা রেহানার হাতে এসব সহায়তা তুলে দেন।
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌস জানান, প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলামের নির্দেশনায় রেহানা ও তার দুই সন্তানের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি রেহানার মানবেতর জীবনযাপনের খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের নজরে আসে। সংবাদে উঠে আসে, দুই সন্তানকে নিয়ে থাকার মতো নিরাপদ ঘর না থাকায় ঘরভাড়ার টাকা জোগাড় করতে নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে বাধ্য হন তিনি।
৩০ বছর বয়সী রেহানা খাতুন রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর এলাকায় খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে চার বছরের ছেলে রোহান ও তিন বছরের মেয়ে আলোমতিকে নিয়ে বসবাস করছিলেন। স্থানীয়দের সহায়তায় বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হলেও টিনের ছাউনি ও বেড়া দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না তার। ফলে রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করেই সন্তানদের নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছিল তাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এর আগে একটি ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরে দুই সন্তানকে নিয়ে থাকতেন রেহানা। কয়েক মাসের ভাড়া পরিশোধ করতে না পারায় সেই ঘরও ছেড়ে দিতে হয়। পরে কখনো অন্যের বাড়িতে, আবার কখনো রেললাইনের পাশে খোলা জায়গায় সন্তানদের নিয়ে রাত কাটাতে হয়েছে তাকে।
ঘরভাড়া পরিশোধের জন্য একপর্যায়ে নিজের মাথার চুল এক হাজার টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হন রেহানা। তার এই দুর্দশার খবর প্রকাশের পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
রোববার রেহানার পরিবারের জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এক মাসের প্রয়োজনীয় শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘর দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কয়েক মাসের খাদ্য ও নগদ অর্থ সহায়তার পাশাপাশি তাকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়ারও আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
রেহানা জানান, তার স্বামী জাফর আলী মাদকাসক্ত। মাদক কেনার টাকা না পেলে তাকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। অনেক সময় ভিক্ষা করে কিংবা মানুষের কাছ থেকে সহায়তা হিসেবে পাওয়া টাকাও তার স্বামী নিয়ে যান বলে জানান রেহানা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহানা বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাবারও নেই। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে চেয়ে যা পাই, তা দিয়েই সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিই। শেষ পর্যন্ত ঘরের ভাড়া দিতে নিজের চুলও বিক্রি করতে হয়েছে। আমার আর কিছু চাওয়ার নেই—সন্তান দুটোকে নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”
রামপাল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তামান্না ফেরদৌস বলেন, তাৎক্ষণিক সহায়তায় রেহানা ও তার দুই সন্তান কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তাদের দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা এবং দুই শিশুর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, রেহানার পরিবারের জন্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদে একটি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি। একই সঙ্গে তার দুই সন্তানের নিরাপদ বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা নিশ্চিত করতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
চুল বিক্রি করে ঘরভাড়া দেওয়ার মতো কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাওয়া রেহানার জীবনে প্রশাসনের এই উদ্যোগ কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে। এখন নিরাপদ একটি ঘর ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ পেলে দুই সন্তানকে নিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করতে পারবেন বলে আশাবাদী তিনি।
মন্তব্য করুন