মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
২ অগাস্ট ২০২৬, ৮:৩৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

দেহ নয় বিবেকের বেচাকেনাই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর পতন

মানুষের জীবনে অর্থের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। অর্থ ছাড়া ব্যক্তি, পরিবার কিংবা রাষ্ট্র—কোনোটিই সচল থাকতে পারে না। কিন্তু যখন অর্থ জীবনের প্রয়োজনীয়তার সীমা অতিক্রম করে নৈতিকতার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, তখন শুরু হয় ভয়াবহ অবক্ষয়ের যাত্রা। সেই যাত্রায় মানুষ শুধু নিজের সততাই হারায় না; হারিয়ে ফেলে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা, ন্যায়বোধ এবং মানবিকতার শেষ আশ্রয়টুকুও।

আমরা প্রায়ই এমন একজন নারীর কথা বলি, যিনি জীবিকার প্রয়োজনে নিজের দেহকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হন। সমাজ তাঁকে সহজেই কঠোর ভাষায় বিচার করে। অথচ একই সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা অর্থের বিনিময়ে নিজের বিবেক, ন্যায়নীতি, দায়িত্ব ও শপথ বিকিয়ে দেন। তাঁদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় ততটা কঠোর হয় না। এখানেই প্রশ্ন জাগে—বিক্রির বিষয়বস্তু কি শুধু দেহ, নাকি বিবেকও?

যখন কোনো কর্মকর্তা ঘুষের বিনিময়ে একটি ফাইলে স্বাক্ষর করেন, তখন সেই স্বাক্ষর শুধু একটি প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করে না; বরং রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানে। যখন কোনো নিয়োগদাতা অর্থের বিনিময়ে যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে অযোগ্য কাউকে চাকরি দেন, তখন তিনি কেবল একজন ব্যক্তির অধিকারই কেড়ে নেন না; ভবিষ্যতের একটি প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিও দুর্বল করে দেন। আবার যখন কোনো রাজনৈতিক পদ বা মনোনয়ন অর্থের বিনিময়ে বণ্টিত হয়, তখন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

একইভাবে, যখন বিচার বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত অর্থের প্রভাবে প্রভাবিত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হন শুধু একজন ব্যক্তি নন; ক্ষতিগ্রস্ত হয় ন্যায়বিচারের প্রতি পুরো সমাজের আস্থা। আইনের শাসন তখন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, সত্যের চেয়ে টাকার মূল্য বেশি।

আরো পড়ুন...  রাজশাহীতে গুলিতে নিহত ১

অর্থলোভের এই সংস্কৃতি শুধু রাষ্ট্রযন্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও। যখন কোনো নারী বা পুরুষ কেবল আর্থিক সুবিধার জন্য সম্পর্ক গড়ে তোলে কিংবা ভেঙে দেয়, তখন সম্পর্কের পবিত্রতা হারিয়ে যায়। ভালোবাসা, বিশ্বস্ততা ও পারস্পরিক সম্মানের মতো মূল্যবোধ অর্থের কাছে পরাজিত হয়। সম্পর্ক তখন আর হৃদয়ের বন্ধন থাকে না; হয়ে ওঠে স্বার্থের হিসাব।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা জরুরি। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় অনেক মানুষ এমন পরিস্থিতিতে পড়েন, যেখানে তাঁদের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি স্বাধীন থাকে না। দারিদ্র্য, বৈষম্য, সহিংসতা কিংবা সামাজিক বঞ্চনা তাঁদের এমন পথে ঠেলে দিতে পারে, যা তাঁরা স্বেচ্ছায় বেছে নেননি। তাই যাঁরা দেহ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁদের প্রত্যেককে একই নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করা ন্যায়সংগত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁরা পরিস্থিতির শিকার। সমাজের দায়িত্ব তাঁদের প্রতি ঘৃণা ছড়ানো নয়; বরং এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলা, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য কাউকে নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিতে বাধ্য হতে না হয়।

অন্যদিকে, যাঁদের হাতে ক্ষমতা, শিক্ষা, সম্মান ও বিকল্প পথ রয়েছে, অথচ তাঁরা সচেতনভাবে অর্থের বিনিময়ে নীতি বিসর্জন দেন, তাঁদের কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি বিস্তৃত। কারণ তাঁদের একটি সিদ্ধান্ত হাজারো মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। একজন দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা, অসৎ রাজনীতিক কিংবা অনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণকারী শুধু নিজের সততাই বিক্রি করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

সমাজে আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত মানদণ্ড কাজ করছে। আমরা দৃশ্যমান পাপকে সহজেই চিহ্নিত করি, কিন্তু অদৃশ্য অনৈতিকতাকে অনেক সময় স্বাভাবিক বলে মেনে নিই। অথচ বিবেকের বেচাকেনা, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি কিংবা বিশ্বাসঘাতকতার ক্ষতি একটি জাতির জন্য অনেক বেশি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

আরো পড়ুন...  মাগুরায় রাকিব হোটেলকে জরিমানা

তাই আমাদের ভাষা ও বিচার যেন মানুষকে অপমান করার জন্য নয়, বরং অন্যায়কে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। কোনো পেশাকে গালি হিসেবে ব্যবহার না করে আমাদের উচিত দুর্নীতি, অনৈতিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। কারণ সমস্যার মূল কোনো নির্দিষ্ট মানুষ নয়; সমস্যার মূল সেই মানসিকতা, যেখানে অর্থকে সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার চেয়ে বড় করে দেখা হয়।

একটি সুস্থ সমাজ গড়তে হলে শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না। প্রয়োজন পরিবারে নৈতিক শিক্ষার চর্চা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূল্যবোধের বিকাশ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। মানুষকে এমন শিক্ষা দিতে হবে, যেখানে অর্থ উপার্জন সম্মানের; কিন্তু অর্থের জন্য আত্মসম্মান ও নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া লজ্জার।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি একটাই—আমরা কী বিক্রি করছি? দেহ, নাকি বিবেক?

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেহের ক্ষত একদিন শুকিয়ে যায়; কিন্তু বিবেকের ক্ষত একটি সমাজকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম রক্তাক্ত করে। তাই আজ সময় এসেছে ব্যক্তি নয়, অনৈতিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর; মানুষকে নয়, দুর্নীতিকে প্রত্যাখ্যান করার।

কারণ যে সমাজে বিবেকের মূল্য অর্থের চেয়ে কমে যায়, সেই সমাজে উন্নয়নের অট্টালিকা যতই উঁচু হোক না কেন, তার ভিত একদিন না একদিন অবশ্যই ভেঙে পড়বে।

লেখক: কবি, কলামিস্ট ও সাংবাদিক

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মার ভয়াল ভাঙন: বিলীন দুই শতাধিক ঘরবাড়ি, শিগগিরই শুরু স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের কাজ

নাচোলে এডিপির অর্থায়নে চার উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করলেন এমপি ড. মিজানুর রহমান

বিশ্বনাথে প্রবাসী ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের নগদ অর্থ সহায়তা বিতরণ

দেহ নয় বিবেকের বেচাকেনাই সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর পতন

চন্দনাইশ থানা পুলিশের অভিযানে দুই আসামি গ্রেপ্তার

মাগুরায় রয়েল ফ্যাশন শো-রুমের উদ্বোধন করলেন ক্রিকেটার এনামুল হক বিজয়

চা শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন বানচালে মিথ্যা মামলা, প্রত্যাহারের দাবিতে মানববন্ধন

আল্লাহর পরিচয় ও কর্তৃত্ব: কুরআনের আলোকে হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকীর ব্যাখ্যা

বিশ্বনাথে জামায়াতের গণমিছিল ও পথসভা

বৃত্তি ব্যবস্থায় সমতা আনতে চার দফা দাবি কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের

১০

জনগণের ভালোবাসা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই: মেয়র প্রার্থী আবির আহমেদ বিপুল

১১

সবুজ খাগড়াছড়ি গড়তে সেনাবাহিনীর উদ্যোগ, বিতরণ করা হলো ৩৫ হাজার বৃক্ষচারা

১২

কাণ্ডের সমাজে দণ্ডের নির্বাসন: ন্যায়বিচারহীনতার অন্ধকারে আমাদের সমাজ

১৩

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে মাগুরায় ১১ দলীয় জোটের গণমিছিল

১৪

শ্রীমঙ্গল ও ভানুগাছ রেলস্টেশন পরিদর্শনে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী

১৫

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণহত্যার বিচারের দাবিতে কিশোরগঞ্জে জামায়াতের গণমিছিল

১৬

পটিয়ায় ইসরাফিলের চার কন্যার লেখাপড়ায় মানবতার বন্ধনের অর্থসহায়তা

১৭

পানছড়িতে বিনামূল্যের চর্ম ও এলার্জি চিকিৎসা ক্যাম্পে রোগীদের ব্যাপক সাড়া

১৮

কুলিয়ারচরে ইউএনও’র হস্তক্ষেপে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীর বাল্যবিবাহ বন্ধ, বাবাকে জরিমানা

১৯

কুলাউড়ার রিজার্ভ বনে দখল সিন্ডিকেটের থাবা, আদালতের নির্দেশও উপেক্ষিত

২০