সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনে ছোট ছোট সংকেত কখনো কখনো বড় পরিবর্তনের পূর্বাভাস বহন করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সংকেত উপেক্ষিত হলে তা একসময় ভয়াবহ সংকটে রূপ নেয়। “অশনি সংকেত : ভবিষ্যতের বার্তাবাহক” শীর্ষক এক বিশ্লেষণধর্মী লেখায় এমনটাই তুলে ধরেছেন কলামিস্ট মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ। তিনি বর্তমান সমাজব্যবস্থা, নৈতিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক বিভাজন এবং মানুষের নীরব কষ্টকে ভবিষ্যৎ বিপদের ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
লেখক বলেন, মানুষের জীবন ও সমাজ এক অদৃশ্য ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। সেই ভারসাম্য নষ্ট হতে শুরু করলে প্রকৃতি, সময় ও সমাজ নানা সংকেত দিতে থাকে। কখনো তা দৃশ্যমান হয়, কখনো নিঃশব্দে সমাজের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো—ছোট ছোট সংকেতকে অবহেলা করলে একসময় তা বড় বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি উল্লেখ করেন, অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো নয়। অতিরিক্ত ক্ষমতা, লোভ কিংবা অহংকার ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে। পৃথিবীর প্রতিটি বিষয় একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে সুন্দর থাকে। সীমা অতিক্রম করলেই ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং সেখান থেকেই অস্থিরতার শুরু হয়।
কলামিস্ট আরও বলেন, সমাজে যখন সত্যের চেয়ে তোষামোদ বেশি মূল্য পায়, নীতির চেয়ে সুবিধাবাদ বড় হয়ে ওঠে এবং অসৎ মানুষের প্রভাব বৃদ্ধি পায়, তখন বুঝতে হবে সমাজ নৈতিক সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই নৈতিক অবক্ষয়ই একসময় সামাজিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
তিনি ছোট ছোট অনিয়মের ভয়াবহ দিকও তুলে ধরেন। একটি ছোট দুর্নীতি বড় দুর্নীতির পথ তৈরি করে, ছোট মিথ্যা বড় প্রতারণায় রূপ নেয় এবং সামান্য অবিচার একসময় গণঅসন্তোষ সৃষ্টি করে। সমাজে এসব অসঙ্গতি ধীরে ধীরে এমনভাবে বিস্তার লাভ করে যে তা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।
বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন লেখক। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ শান্তি, নিরাপত্তা ও সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়। কিন্তু তাদের কষ্ট ও হতাশা যখন উপেক্ষিত হয়, তখন সেটিও অশনি সংকেত হয়ে ওঠে।
লেখক মনে করেন, জনগণের নীরব ক্ষোভই ইতিহাসের বড় পরিবর্তনের মূল শক্তি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে মানুষ প্রতিবাদ করবেই, কারণ প্রতিবাদ মানুষের সহজাত অধিকার। ইতিহাসের প্রতিটি বড় পরিবর্তনের পেছনে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও কষ্ট কাজ করেছে।
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। যে সমাজ আত্মসমালোচনা করতে জানে না, ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না এবং জনগণের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দেয় না, সেই সমাজ ধীরে ধীরে সংকটের দিকে এগিয়ে যায়। তাই অশনি সংকেতকে ভয় না পেয়ে তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
লেখাটির শেষাংশে কলামিস্ট বলেন, একটি মানবিক রাষ্ট্রের মূল পরিচয় হলো জনগণের অনুভূতি ও কষ্টকে গুরুত্ব দেওয়া। কারণ সাধারণ মানুষের আশা খুব সামান্য—তারা শান্তিতে, নিরাপদে ও সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চায়। জনগণের কান্না কখনো বৃথা যায় না; সময়ের দেয়ালে লেখা অশনি সংকেতই একদিন কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়।
মন্তব্য করুন