মিশরের রাজধানী কায়রোতে আধ্যাত্মিকতা, মানবতা ও আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্যের এক অনন্য পরিবেশে ছারছীনা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন আলহাজ হযরত মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন (হাফিজাহুল্লাহ)-কে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ ও বিশেষ দোয়া মাহফিল।
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সন্ধ্যায় কায়রোর গ্র্যান্ড কনফারেন্স হল, বুরজ আত-তাতবিকিয়্যিনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের আলেম, গবেষক, শিক্ষার্থী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশগ্রহণ করেন।
ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটি, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মরহুম মুজাদ্দিদে জামান আলহাজ শাহ সূফি মোহাম্মাদ মোহেব্বুল্লাহ (রহ.)-এর জীবন, কর্ম, আধ্যাত্মিক অবদান ও ইসলামী সমাজ সংস্কারে তাঁর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনায় ঈসালে সাওয়াব ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।
ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটির আহ্বায়ক সাইমুম আল-মাহদী আল-আযহারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে। তিলাওয়াত করেন মিশরের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ইমাম ও খতিব শায়খ মোহাম্মাদ সাঈদ। পরে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সাইফুর রহমান আল-আযহারী।
বক্তারা বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ছারছীনা শরীফের শতবর্ষব্যাপী দ্বীনি খেদমত, শিক্ষা বিস্তার, তাসাউফ চর্চা, মানবকল্যাণমূলক কার্যক্রম এবং মরহুম শাহ মোহাম্মাদ মোহেব্বুল্লাহ (রহ.)-এর জীবনাদর্শ ও তাজদিদি মিশনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। তারা বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা, সমাজ সংস্কার ও আধ্যাত্মিক জাগরণে তাঁর অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
অনুষ্ঠানে আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রায় ২০টি দেশের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ছাড়াও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে ছিল বাংলাদেশ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার সোসাইটি, বাংলাদেশ ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, আল-আযহার স্টুডেন্ট ফোরাম, ফিলিস্তিনি মানবিক সহায়তা সংস্থা, ছারছীনা দারুসসুন্নাত সোসাইটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে পীর সাহেবের হাতে সম্মাননা স্মারক, ক্রেস্ট ও ফুলেল শুভেচ্ছা তুলে দেওয়া হয়। মিশরের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বৃহত্তম প্ল্যাটফর্ম ‘ইত্তেহাদ’-এর পক্ষ থেকে সংগঠনের উপদেষ্টা প্রধান শিহাবউদ্দিন আল-আযহারী বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করেন। এছাড়া ভারতের ঐতিহ্যবাহী ফুরফুরা দরবার শরীফের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে শুভেচ্ছা জানান।
বক্তারা বলেন, শিক্ষা, দাওয়াহ, সমাজকল্যাণ ও মানবসেবায় ছারছীনা দরবার শরীফের অবদান মুসলিম সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ইত্তেহাদুল আরবের সভাপতি ড. মোহাম্মাদ মাখযুমি বলেন, “তাসাউফের বিশুদ্ধ চর্চা, মানবিক মূল্যবোধ এবং ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারে ছারছীনা দরবার শরীফের ভূমিকা মুসলিম উম্মাহর জন্য অনুসরণীয়।”
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ফিলিস্তিনি শরণার্থী ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর মাঝে ত্রাণ বিতরণ কর্মসূচি। ছারছীনা দরবার শরীফের আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা সংস্থা ‘হেমায়েতে ইসলাম বাংলাদেশ’-এর উদ্যোগে মিশরে অবস্থানরত ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তু পরিবারের মধ্যে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়। মানবিক এই উদ্যোগ উপস্থিত অতিথিদের মাঝে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে।
সমাপনী বক্তব্যে পীর সাহেব হযরত মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছারুদ্দীন আহমদ হুসাইন (হাফিজাহুল্লাহ) মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ আকিদা, উত্তম আখলাক, তাকওয়া এবং সুন্নতে নববীর আদর্শে নিজেদের গড়ে তুলে মানবতার কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান।
দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়। আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণা, আন্তর্জাতিক সৌহার্দ্য এবং মানবিক দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠান অংশগ্রহণকারীদের হৃদয়ে গভীর ছাপ রেখে যায়।
লেখক: জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান
কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর
মন্তব্য করুন