
সাম্প্রতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত ড. আবদুল্লাহ জাফের বিন আবিয়াহ গত ১৫ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লে. জে. (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট প্রদান সংক্রান্ত কাজের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা জানান এবং বলেন, সৌদি আরবে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এ বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এই বক্তব্য থেকেই প্রতীয়মান হয়, বিষয়টি নতুন নয় এবং বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে এ নিয়ে আগেই কোনো না কোনো পর্যায়ের সমঝোতা হয়েছে, যা এতদিন সাধারণ জনগণ বা গণমাধ্যমের অজানা ছিল। প্রশ্ন হলো—এত বড় ও সংবেদনশীল একটি বিষয়ে কেন জনসমক্ষে আলোচনা বা সংসদীয় পর্যবেক্ষণ ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে?
বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভার বহন করছে। এই জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাজনৈতিক জটিলতা ক্রমেই বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় নতুন করে আরও ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসংগত—সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। বিশেষ করে, একটি অন্তর্বর্তী সরকার হিসেবে এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও রাষ্ট্রীয় প্রভাবসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার তাদের আছে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত দেড় বছরে মিয়ানমার সীমান্তে শিথিলতার সুযোগে প্রায় দুই লাখ নতুন রোহিঙ্গা অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি রয়েছে। অথচ সরকারিভাবে বরাবরই বলা হয়েছে, রোহিঙ্গারা শিগগিরই নিজ দেশে ফিরে যাবে। বাস্তবতা এর সম্পূর্ণ বিপরীত।
এদিকে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও আশাব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিনিয়োগ কমেছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে, রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে, যা আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জনসংখ্যার ওপর অতিরিক্ত চাপ রাষ্ট্রের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করবে—এটাই স্বাভাবিক।
এর পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকার একের পর এক বিতর্কিত বৈদেশিক সিদ্ধান্তে জড়িয়ে পড়ছে—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরটিএ, বোয়িং উড়োজাহাজ ক্রয়, বন্দর ইজারা, পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান কেনা, গাজা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার তৎপরতা ইত্যাদি। অথচ সামনে জাতীয় নির্বাচন, যেখানে তাদের প্রধান দায়িত্ব হওয়ার কথা একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—১২ ফেব্রুয়ারির পরও কি তারা ক্ষমতায় থাকার কোনো পরিকল্পনা করছে? নাকি সে কারণেই ভবিষ্যৎ সরকারের কাঁধে ফেলে যাওয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে?
রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য আর কেবল মানবিক ইস্যু নয়—এটি এখন অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন। এই সংকট সমাধানে প্রকৃত ও স্বচ্ছ উদ্যোগের বদলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের বৈধতা দেওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
অতএব, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান— সৌদি আরবে অবস্থানরত ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করুন, সীমান্তে কঠোরতা নিশ্চিত করুন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন, যা ভবিষ্যৎ সরকার ও দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। অন্যথায়, এসব সিদ্ধান্ত জনমনে আস্থাহীনতা আরও বাড়াবে—যা কোনো সরকারের জন্যই শুভ নয়।
লেখক: অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি
সাবেক পরিচালক, বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়
মন্তব্য করুন