
বনদস্যুদের অপহরণ ও চাঁদাবাজির আতঙ্কে সুন্দরবন সংলগ্ন দুবলারচরের অন্তত দশ সহস্রাধিক শুঁটকি প্রক্রিয়াজাতকরণে জড়িত জেলে সাগর ও নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রেখে চরে অবস্থান নিয়েছেন। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে তারা মাছ ধরা বন্ধ করেন। এর আগে সোমবার রাতে অপহৃত ২০ জেলের এখনো কোনো সন্ধান না মেলায় জেলেদের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বনবিভাগও রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কায় পড়েছে।
দুবলারচর ফিসারমেন গ্রুপের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কামাল উদ্দিন আহমেদ বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে দুবলার আলোরকোল এলাকা থেকে মোবাইল ফোনে জানান, সুন্দরবন ও সাগরে চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে জেলেরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। বনদস্যুদের অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় তারা বাধ্য হয়ে মাছ ধরা বন্ধ করেছেন। মৌসুমের শেষ সময়ে এসে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বহু জেলে মানবেতর অবস্থায় পড়েছেন।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় জাহাঙ্গীর, সুমন, শরীফ ও করিম বাহিনী নামে অন্তত চারটি দস্যু চক্র সক্রিয় রয়েছে। এসব চক্র জেলেদের অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায় করছে। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটছে। গত সপ্তাহে দস্যুদের মারধরে গুরুতর আহত চার জেলে রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
২০১৮ সালে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও বর্তমানে আবারও দস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে বলে অভিযোগ করেন জেলেনেতারা।
আলোরকোল এলাকার রামপাল জেলে সমিতির সভাপতি মোতাসিম ফরাজী বলেন, “আগে প্রবাদ ছিল— জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে— সাগরে গেলে ডাকাত।” তিনি দাবি করেন, গত ১৫ দিনে বহু জেলে অপহরণের শিকার হয়েছেন এবং বর্তমানে শতাধিক জেলে দস্যুদের কব্জায় থাকতে পারেন। সোমবার রাতে অপহৃত ২০ জেলের সঙ্গেও এখনো যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।
এদিকে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় রাজস্ব আদায়ে চাপের মুখে পড়েছে বনবিভাগ। সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগ–এর জেলেপল্লী দুবলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, ফরেস্ট রেঞ্জার মিলটন রায় জানান, জেলেরা পাস সংগ্রহ না করায় রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শরণখোলা ফরেস্ট স্টেশন কর্মকর্তা, ফরেস্ট রেঞ্জার মো. খলিলুর রহমান বলেন, বনদস্যু আতঙ্কে কোনো জেলে স্টেশন অফিস থেকে মাছ ধরার অনুমতিপত্র নিচ্ছেন না। ফলে মাসিক রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে জেলেদের সাগরে না যাওয়ার প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজার ব্যবস্থায়ও। শরণখোলা বাজারের ব্যবসায়ী জালাল মোল্লা, আনোয়ার সওদাগর ও রিপন হাওলাদারসহ কয়েকজন জানান, জেলেরা সুন্দরবনে না যাওয়ায় তাদের বেচাকেনা প্রায় বন্ধের পথে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরীফুল ইসলাম বলেন, বনদস্যুদের তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বনরক্ষীরা কাজ করছেন বলেও তিনি দাবি করেন।
এদিকে অপহৃত জেলেদের দ্রুত উদ্ধারে কার্যকর অভিযান পরিচালনা এবং সুন্দরবনে সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা।
মন্তব্য করুন