
চৈত্রের তীব্র খরতাপে রাজশাহী অঞ্চলের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। টানা দুই দিন ধরে বয়ে চলা তাপপ্রবাহে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ। প্রচণ্ড রোদ ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে, শ্রমিকরা অল্প সময় কাজ করেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন।
নগরের পঞ্চবটী এলাকায় ইট ভাঙার কাজ করতে দেখা যায় শ্রমিক মো. রেজাউল করিমকে। মাথায় গামছা জড়িয়ে তীব্র রোদে কাজ করছেন তিনি। ঘামে ভেজা শরীরে কিছুক্ষণ পরপরই কাজ থামিয়ে বিশ্রাম নিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, “আগের মতো আর কাজ করা যায় না। আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা কাজ করলেই শরীর আর সাড়া দেয় না। গরম খুব বেশি।”
একই এলাকার আরেক শ্রমিক জাহাঙ্গীর জানান, “গরম যতই হোক, কাজ তো করতেই হবে। না করলে সংসার চলবে না।” শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তীব্র গরমের কারণে তাদের কাজের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। একটানা কাজের পরিবর্তে এখন ঘন ঘন বিরতি নিতে হচ্ছে। কেউ ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছেন, আবার কেউ বারবার পানি পান করে নিজেকে সুস্থ রাখার চেষ্টা করছেন। শ্রমিক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “মাঝে মাঝে মেশিন বন্ধ করে বিশ্রাম নিতে হয়, না হলে কাজ করা সম্ভব হয় না।”
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর-এর তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় রাজশাহীতে চলতি মৌসুমের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিন তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই দিন সকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকলে তাকে তাপপ্রবাহ বলা হয়। সেই হিসাবে রাজশাহীতে টানা দুই দিন ধরে তাপপ্রবাহ বিরাজ করছে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। মাঝেমধ্যে বৃষ্টির কারণে সাময়িক স্বস্তি মিললেও সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা আবার বাড়ছে এবং এ প্রবণতা আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তাপপ্রবাহের প্রভাব শুধু শ্রমজীবী মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নগরের সাধারণ মানুষও চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। কাজলা এলাকার রিকশাচালক সোহেল রানা বলেন, “গরম বেশি হওয়ায় মানুষ কম বের হচ্ছে, ফলে আয়ও কমে গেছে।” অন্যদিকে, আলুপট্টি এলাকায় পদ্মা নদীর তীরে গাছের ছায়ায় বসে থাকা মো. বাতেন বলেন, “রোদে কোথাও দাঁড়ানো যাচ্ছে না। বাতাসও গরম, তাই ছায়াতেই সময় কাটাচ্ছি।”
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আগাম প্রস্তুতি নিয়েছে। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, উত্তরাঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় হিটস্ট্রোকসহ বিভিন্ন রোগীর সংখ্যা বাড়তে পারে। এ কারণে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ‘হিট স্ট্রোক কর্নার’ চালু রাখা হয়েছে।
তিনি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন। গরমে ভাজাপোড়া ও খোলা খাবার এড়িয়ে চলা, ঢিলেঢালা পোশাক পরা, বাইরে বের হলে ছাতা ব্যবহার করা এবং সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণের ওপর জোর দেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
সব মিলিয়ে, তীব্র তাপপ্রবাহে রাজশাহীর জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মন্তব্য করুন