হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
১৩ অগাস্ট ২০২৬, ৫:৪১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

রাসূল সা.-এর আদর্শই সর্বোত্তম আদর্শ

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মা বা’দ”—বিশ্ব ইতিহাসে হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। তিনি সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব এবং আল্লাহর প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল। আরবের জাহেলিয়া বা অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে তিনি মানবতার মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। মহান আল্লাহ তাঁকে সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তাই তাঁর প্রতি আমাদের অগণিত দরুদ ও সালাম—সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আবদুল্লাহ এবং মাতার নাম আমিনা। জন্মের আগেই তিনি পিতাকে হারান। মাত্র ছয় বছর বয়সে মায়ের ইন্তেকালের পর দাদা আবদুল মুত্তালিব ও পরে চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে তাঁর শৈশব কাটে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদী, শান্ত, সংযমী ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী। সমাজের অন্যায়, অবিচার, হানাহানি ও দুর্বলদের ওপর নির্যাতন তাঁর হৃদয়কে ব্যথিত করত।

কৈশোরে আরব সমাজের নানা অনাচার দেখে তিনি শান্তি ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার চিন্তায় উদ্বুদ্ধ হন। এ প্রেক্ষাপটে তিনি সমমনা তরুণদের সঙ্গে নিয়ে ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে একটি শান্তিসংঘে যুক্ত হন। অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এবং নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। মানবিকতা, ন্যায় ও শান্তির পক্ষে তাঁর এই অবস্থান পরবর্তী জীবনেও অব্যাহত ছিল।

পরবর্তীতে মানবতার মুক্তির পথের সন্ধানে তিনি মক্কার অদূরে হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যান ও চিন্তায় নিমগ্ন হতেন। সেখানেই মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে তাঁর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি নবুয়তের দায়িত্ব লাভ করেন এবং মানুষের সামনে তাওহিদ, ন্যায়, সত্য ও মানবিকতার বাণী তুলে ধরতে শুরু করেন।

মহানবী (সা.)-এর দাওয়াত সহজে গ্রহণ করেনি তৎকালীন ক্ষমতাবান ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজের একটি অংশ। তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদের নানা অত্যাচার, নির্যাতন ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হননি। ধৈর্য, প্রজ্ঞা, ক্ষমা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে মানুষের হৃদয় জয় করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে আরব সমাজে ন্যায়, সাম্য, মানবিকতা ও ভ্রাতৃত্বের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।

আরো পড়ুন...  হিলিতে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ

মহানবী (সা.)-এর জীবন শুধু ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; ব্যক্তিজীবন থেকে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। সততা, আমানতদারি, ধৈর্য, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও ন্যায়পরায়ণতার অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর চরিত্রে। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে তাঁর চরিত্রকে উত্তম চরিত্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

পারিবারিক জীবনেও মহানবী (সা.) ছিলেন দায়িত্বশীল ও স্নেহশীল। স্ত্রীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সৌহার্দ্য, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। সন্তানদের প্রতিও তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ। ছেলে-মেয়ের মধ্যে বৈষম্য না করার শিক্ষা দিয়েছেন এবং সন্তানদের যথাযথ অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।

আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রতিও মহানবী (সা.) ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল। তিনি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল—একজন মানুষ নিজে ভালো থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; আশপাশের মানুষও যেন নিরাপদ, সম্মানিত ও সহযোগিতা পায়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। দরিদ্র, অসহায় ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তিনি বারবার মানুষকে উৎসাহিত করেছেন।

সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও মহানবী (সা.)-এর আদর্শ ছিল অনন্য। তিনি শোষণ, বৈষম্য, অন্যায় ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। নারীকে মর্যাদা দেওয়া, দুর্বল মানুষের অধিকার নিশ্চিত করা এবং মানুষের মধ্যে সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজব্যবস্থায় মানুষের মর্যাদা নির্ধারণে বংশ, সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে ন্যায় ও মানবিকতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্র পরিচালনায়ও মহানবী (সা.) ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। মদিনায় প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি আইন ও ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রে ধনী-গরিব, প্রভাবশালী-সাধারণ—কাউকে আলাদা চোখে দেখেননি। তাঁর কাছে ন্যায়বিচার ছিল সবার জন্য সমান।

ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতিও মহানবী (সা.) সহনশীল ও উদার ছিলেন। যুদ্ধবন্দীদের সঙ্গে মানবিক আচরণ, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং তাদের অধিকার রক্ষার নানা দৃষ্টান্ত তাঁর জীবনে রয়েছে। তিনি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের পাশাপাশি শান্তি ও সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দিয়েছেন।

আরো পড়ুন...  কালিহাতীতে ওয়াজ মাহফিল ও হালকায়ে জিকির অনুষ্ঠিত

মহানবী (সা.) ছিলেন ক্ষমা ও দয়ার অনন্য দৃষ্টান্ত। যারা তাঁকে নির্যাতন করেছে, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে এবং তাঁকে নিজের মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করেছে—তাদের অনেককেই তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন। মক্কা বিজয়ের সময় তাঁর সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা তাঁর মহানুভবতার অন্যতম উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমা ও মানবিকতাকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের জন্য শুধু অতীতের একটি ইতিহাস নয়; বরং বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের জন্যও একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর শিক্ষা অনুসরণ করলে ন্যায়, শান্তি, মানবিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আপনি উত্তম চরিত্রের অধিকারী।” মহানবী (সা.)-এর জীবন তাই সত্য, ন্যায়, দয়া, ক্ষমা, সহনশীলতা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

বর্তমান বিশ্বে যখন নানা ধরনের সংঘাত, হিংসা, বিদ্বেষ ও বিভাজন মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তাকে ব্যাহত করছে, তখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ন্যায়, সহনশীলতা, ক্ষমা ও মানবিকতার আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবনাদর্শ অনুসরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি ও সমাজে শান্তি, সৌহার্দ্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে।

মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ ও তাঁর শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট। সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

শ্রীমঙ্গলে বাসে যাত্রী ওঠানামার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন

খাগড়াছড়ির হর্টিকালচার পার্কে নতুন তিন আকর্ষণ

মাগুরায় মার্কেটের ৬ দোকানে শাটার ভেঙে চুরি

টঙ্গীতে দেশীয় অস্ত্রসহ দুই ছিনতাইকারী গ্রেপ্তার

মৌলভীবাজার অনলাইন প্রেসক্লাবের একযুগপূর্তি উদযাপন

রাসূল সা.-এর আদর্শই সর্বোত্তম আদর্শ

শ্রীপুর বালিকা বিদ্যালয়ে এডহক কমিটির অভিষেক

কালিয়াকৈরে দিনে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং, ব্যাহত শিল্প উৎপাদন-চিকিৎসা-শিক্ষা

সরকার ও বিএনপি থেকে পদত্যাগ করলেন মির্জা ফখরুল

ইতিহাসে আজকের এই দিনে

১০

ইভটিজিংয়ের প্রতিবাদ করায় ১২ বছরের স্কুলছাত্রীকে রড দিয়ে মারধর

১১

নাচোলে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রতিবাদে পাল্টা মানববন্ধন

১২

শ্যামনগরে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু

১৩

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে রাত ৮টার পর শপিংমল ও মার্কেট বন্ধের নির্দেশ

১৪

সিরাজ উদ্দিন মেমোরিয়াল কলেজে এমপি আব্দুল আলীমের মতবিনিময় সভা

১৫

মোরেলগঞ্জে আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত

১৬

হিলিতে দিনব্যাপী বিনামূল্যে চক্ষু শিবির, সেবা পেলেন দুই শতাধিক রোগী

১৭

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আন্তর্জাতিক যুব দিবসে জামায়াতের র‍্যালি ও আলোচনা সভা

১৮

খাগড়াছড়ির হোটেলে ৫০ পিস ইয়াবা উদ্ধার, দুই যুবক কারাগারে

১৯

ভাণ্ডারিয়ায় কলেজে পরীক্ষা দিতে গিয়ে নিখোঁজ গৃহবধূ, চারদিনেও সন্ধান মেলেনি

২০