দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়। তবে বরখাস্তের আদেশ জারির পরও বিষয়টি প্রায় দুই সপ্তাহ গোপন রাখা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, গত ৭ মে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইদুর রহমান খান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। যদিও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। পরে বুধবার (২০ মে) দুপুরে গোপন সূত্রে সংবাদটি প্রকাশ্যে এলে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (ডিআরআরও) বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেন।
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, দুদকের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় সরকারি চাকরি বিধিমালা অনুযায়ী আবুল কালাম আজাদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ৪ মে থেকে এ আদেশ কার্যকর ধরা হবে এবং মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বিধি অনুযায়ী খোরপোষ ভাতা পাবেন।
এর আগে, গত ৩ মে রাতে পাবনার নিজ বাসা থেকে দুদকের একটি দল অভিযান চালিয়ে আবুল কালাম আজাদকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন তাকে আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আবুল কালাম আজাদ টানা তিন দফায় প্রায় ১৪ বছর ধরে শাহজাদপুর উপজেলায় পিআইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন একই উপজেলায় কর্মরত থাকার কারণে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও ওঠে।
এ বিষয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল বাছেদ বলেন,
“বিষয়টি আমরা আগেই মৌখিকভাবে জেনেছিলাম। তবে অফিসিয়াল চিঠি বুধবার হাতে পেয়েছি।”
দুদকের মামলার নথি সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। পরে ২০২৪ সালের ৮ মে তার, স্ত্রী মর্জিনা খাতুন এবং ছেলে ফজলে রাব্বি রিয়নের নামে সম্পদের হিসাব দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ৩ জুলাই তারা সম্পদের বিবরণী জমা দেন।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১১ মার্চ দুদকের সহকারী পরিচালক সাধন চন্দ্র সূত্রধর বাদী হয়ে তাদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, আবুল কালাম আজাদ প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ ৪৬ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন, যা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এছাড়া তার স্ত্রী মর্জিনা খাতুনের বিরুদ্ধে স্বামীর অবৈধ আয়ের মাধ্যমে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৩ হাজার ৪৮৩ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়। একইসঙ্গে ছেলে ফজলে রাব্বি রিয়নের বিরুদ্ধে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ৩৬ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ ভোগদখলের অভিযোগ আনা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে আবুল কালাম আজাদের শ্যালক জামাল উদ্দিন ফকিরের নামেও বিপুল পরিমাণ অস্বাভাবিক সম্পদের তথ্য উঠে আসে। পরে তার বিরুদ্ধেও পৃথক মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় জামাল উদ্দিন ফকিরকে প্রধান এবং আবুল কালাম আজাদকে দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, তদন্তে স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। এসব সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, দীর্ঘদিন ধরে একই উপজেলায় দায়িত্ব পালন এবং বিপুল সম্পদের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর শাহজাদপুরজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, এতদিন ধরে অভিযোগ থাকার পরও কেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সচেতন মহলের দাবি, শুধু সাময়িক বরখাস্ত নয়, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মন্তব্য করুন