আজ বিশ্ব মা দিবস। প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হয় গভীর ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের মধ্য দিয়ে। মা শুধু একটি শব্দ নয়, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ সম্পর্কের প্রতীক। সন্তানের জন্ম থেকে জীবনের প্রতিটি ধাপে যিনি নিঃশব্দে ভালোবাসা, ত্যাগ ও মমতা দিয়ে আগলে রাখেন, তিনিই মা।
জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় একজন মা। শিশুর ভাষা শেখা, হাঁটা শেখা, ভালো-মন্দ বোঝা—সবকিছুর শুরু হয় মায়ের হাত ধরেই। একজন সন্তানের ব্যক্তিত্ব গঠন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে মায়ের অবদান অপরিসীম। তাই পৃথিবীর সব ভাষা ও সংস্কৃতিতে মায়ের মর্যাদা সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থান করে।
বর্তমান সময়ের ব্যস্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যাচ্ছে। কর্মব্যস্ততা, দূরত্ব কিংবা জীবনের নানা চাপের কারণে অনেক সন্তান মায়ের সঙ্গে সময় কাটাতে পারে না। অথচ একজন মা সন্তানের একটি ফোন কল, সামান্য খোঁজ কিংবা কিছু সময় পেলেই আনন্দে ভরে ওঠেন। মা দিবস সেই অনুভূতি ও দায়িত্বের কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দেয়।
মা দিবসের ইতিহাসও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের আনা জার্ভিস নামের এক নারী তার মায়ের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১৯০৮ সালে প্রথম মা দিবস উদযাপন করেন। পরে ১৯১৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রোববারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মাদার্স ডে’ ঘোষণা করেন। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিনটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশেও এখন দিনটি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়।
তবে মা দিবস কেবল ফুল, উপহার বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি পোস্ট করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। প্রকৃত সম্মান হলো মায়ের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া, তার অনুভূতির মূল্য দেওয়া এবং তার কষ্ট বোঝার চেষ্টা করা। একজন মা সারাজীবন নিজের স্বপ্ন ও আরাম বিসর্জন দিয়ে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে নিরলস পরিশ্রম করেন। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মায়েরা সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও সন্তানদের মুখে হাসি ফোটাতে সংগ্রাম করে যান।
বর্তমান সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বৃদ্ধি আমাদের মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকটিও সামনে নিয়ে আসে। যেসব মা একসময় সন্তানকে বুকে আগলে বড় করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে তাদের অনেকেই অবহেলার শিকার হন। মা দিবস আমাদের শেখায়—মায়ের প্রতি দায়িত্ব শুধু অর্থনৈতিক সহায়তায় শেষ হয় না; প্রয়োজন ভালোবাসা, সময় ও সম্মান।
ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ইসলামে মায়ের প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত।” শুধু ইসলাম নয়, প্রায় সব ধর্ম ও সংস্কৃতিতেই মাকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
সবশেষে বলা যায়, মা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। মায়ের ভালোবাসার কোনো বিকল্প নেই। তাই শুধু একটি দিন নয়, প্রতিটি দিনই হোক মায়ের প্রতি ভালোবাসা, যত্ন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। কারণ মা ভালো থাকলে পরিবার ভালো থাকে, আর পরিবার ভালো থাকলে সুন্দর হয় সমাজ ও দেশ।
মন্তব্য করুন