গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার সদর বাজারসহ বিভিন্ন মুরগি পট্টিতে ভয়াবহ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মুরগি প্রক্রিয়াজাত করার অভিযোগ উঠেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একই ড্রামের কালো, দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে শত শত মুরগি ড্রেসিং করা হচ্ছে, ফলে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন সাধারণ ক্রেতারা।
শনিবার সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনের চালার নিচে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চলছে মুরগি ড্রেসিং কার্যক্রম। এক শ্রমিক নীল রঙের ড্রামের পাশে দাঁড়িয়ে লম্বা লাঠি দিয়ে গরম পানিতে মুরগি চুবাচ্ছেন। পাশে ময়লাযুক্ত ড্রেসিং মেশিন ও ঝাড়ু পড়ে আছে। কাদা-পানিতে একাকার মেঝেতে বসেই মুরগির পালক ছাড়ানো হচ্ছে। খাঁচায় গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে জীবন্ত মুরগি, আরেকজন কর্মচারী একই ড্রামের পানিতে মুরগি ধুচ্ছেন। পুরো পরিবেশই নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে।
প্রতিটি ড্রামে প্রায় ৩০০টি মুরগি ড্রেসিং করা হলেও পানি পরিবর্তনের কোনো লক্ষণ নেই। সরেজমিনে সদর বাজারসহ বিভিন্ন মুরগি পট্টির অন্তত ১৫ থেকে ২০টি দোকানে একই চিত্র দেখা গেছে। প্রতিটি দোকানের সামনে বড় ড্রামে সকাল ৭টায় পানি গরম করা হয় এবং সেই পানি দিয়েই সন্ধ্যা পর্যন্ত ২০০ থেকে ৩০০টি মুরগি ড্রেসিং করা হয়। দীর্ঘ সময় ব্যবহারের ফলে পানি কালো হয়ে যায়, এতে ভেসে ওঠে রক্ত, পালক ও নাড়িভুঁড়ির অংশ—দুর্গন্ধে সেখানে টেকাই দায়।
এক মুরগি ব্যবসায়ী বলেন, ঘন ঘন পানি বদলাইতে গেলে গ্যাস বেশি লাগে, সময়ও নষ্ট হয়। কাস্টমার দাঁড়াইয়া থাকে। সকালের পানিই সারাদিন চালাই। সবাই তো এমনে করে।
বাজারে মুরগি কিনতে আসা স্কুলশিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, “চোখের সামনে দেখতেছি কালো পানিতে মুরগি চুবাইতেছে। গন্ধে বমি আসে। বাসায় নিয়ে আবার গরম পানি, লবণ, ভিনেগার দিয়ে ধুই। তবুও ভয় লাগে। বাচ্চারা খায়—এইভাবে রোগজীবাণু ছড়াচ্ছে।”
গৃহিণী সালমা আক্তার বলেন, বাজারের সব দোকানেই একই অবস্থা। উপায় নাই দেখে কিনতে হয়। প্রশাসন নিয়মিত নজরদারি করলে তারা এই সাহস পেত না।
কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার জানান, একই পানিতে শত শত মুরগি ড্রেসিং করলে সালমোনেলা, ই-কোলাই, ক্যাম্পাইলোব্যাক্টর ও কলেরার জীবাণু দ্রুত ছড়ায়। একটি অসুস্থ মুরগির জীবাণু অন্য সব মুরগিতে সংক্রমিত হতে পারে। এ ধরনের মাংস খেলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, ফুড পয়জনিং, এমনকি কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য এটি প্রাণঘাতীও হতে পারে।
উপজেলা স্যানিটারি কর্মকর্তা বলেন, ফেসবুকে এ ধরনের ছবি দেখেছি। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালানো হবে। একই পানি সারাদিন ব্যবহার করলে দোকান সিলগালা ও জরিমানা করা হবে।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ.এইচ.এম. ফখরুল হোসাইন বলেন, “জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এ ধরনের কার্যক্রম কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও দোকান সিলগালা করা হবে। নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের অনিয়ম চললেও কার্যকর নজরদারির অভাবে ব্যবসায়ীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। দ্রুত তদারকি জোরদার করে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
মন্তব্য করুন