গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত গাজীপুর হাইটেক পার্ক রেলওয়ে স্টেশন এখন কার্যত অব্যবহৃত ও অব্যবস্থাপনার কারণে নানা সংকটে পড়েছে। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও উন্নত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও যাত্রী সংকট, জনবল ঘাটতি এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে স্টেশনটি সরকারের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর এই স্টেশনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। সাভার ও গাজীপুর শিল্পাঞ্চল, হাইটেক সিটি এবং আশপাশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কর্মসংস্থান কেন্দ্রকে কেন্দ্র করে প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ হাজার যাত্রী সেবা দেওয়ার লক্ষ্য ছিল এই প্রকল্পের। কিন্তু বাস্তবে প্রত্যাশিত যাত্রী না থাকায় স্টেশনটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।
স্টেশন পরিচালনার জন্য ১২টি অনুমোদিত পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৬ জন। স্টেশন মাস্টার ও নিরাপত্তা প্রহরীর পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। ফলে বুকিং সহকারীকে একাই টিকিট বিক্রি, সিগন্যালিং এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মতো একাধিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। জনবল সংকটের কারণে ভিআইপি লাউঞ্জ, ওয়েটিং রুম এবং টয়লেটসহ বিভিন্ন সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ রয়েছে। একইসঙ্গে মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্রও অযত্নে নষ্ট হচ্ছে।
স্টেশন সহকারী মাস্টার খায়রুল ইসলাম বলেন, “১২ জনের জায়গায় আমরা ৬ জন কাজ করছি। নিরাপত্তা প্রহরী নেই, স্টেশন মাস্টার নেই। সন্ধ্যার পর নিরাপত্তাহীনতায় থাকতে হয়, তাই তালা লাগিয়ে বসে থাকতে হয়। মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা খরচ হলেও আয় হয় মাত্র ১ লাখ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এটি সম্পূর্ণ লোকসানি প্রকল্প।”
বর্তমানে দিনে ১৬ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও যাত্রাবিরতি দেয় মাত্র একটি লোকাল ট্রেন সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস। টিকিট বরাদ্দও সীমিত, ফলে স্থানীয়রা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
স্থানীয় যাত্রী ও শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, হাইটেক পার্ক, শিল্পাঞ্চল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো মানুষ এই স্টেশন ব্যবহার করতে পারতেন, কিন্তু আন্তঃনগর ট্রেন না থামায় তারা বাস ও অন্যান্য যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। এতে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হচ্ছে।
ইউনিভার্সিটি অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির শিক্ষার্থী রেজওয়ান বলেন, “স্টেশনটা আমাদের পাশেই, কিন্তু কোনো ট্রেন থামে না। বাসে ৮০ টাকা ভাড়া দিয়ে ঢাকায় যেতে হয়, তিন ঘণ্টা জ্যামে সময় নষ্ট হয়।”
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় স্টেশনটি সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আড্ডাখানায় পরিণত হয়। দিনের বেলায় কিছু অংশে শিক্ষার্থীরা ভিডিও ধারণ করলেও রাত নামলেই ফাঁকা প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আনাগোনা দেখা যায় বলে দাবি এলাকাবাসীর।
কালিয়াকৈর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এএইচএম ফখরুল হোসাইন জানান, বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সংসদ সদস্যকে জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, যাত্রী চাহিদা থাকা সত্ত্বেও স্টেশনটির পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত অন্তত ৪-৫টি আন্তঃনগর ট্রেনের যাত্রাবিরতি, শূন্য পদে জনবল নিয়োগ এবং জিআরপি পুলিশের স্থায়ী টহল নিশ্চিত করা না হলে এই বিশাল ব্যয়ের প্রকল্পটি পুরোপুরি ব্যর্থতায় পরিণত হবে।
মন্তব্য করুন