সরকারের দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের পরিবারের নারীদের জন্য চালু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পে যশোরে ৬২ জন ধনী পরিবারের নারী অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের বাছাই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালকসহ তিন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ফ্যামিলি কার্ডের তালিকা প্রণয়নের সময় একাধিক ধনী পরিবারের নারী উপকারভোগীর তালিকায় স্থান পান। তাদের মধ্যে বহুতল ভবনের মালিক পরিবারের সদস্যও রয়েছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মেলায় ৬২ জনের কার্ড স্থগিত করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া কর্মকর্তারা হলেন—যশোর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক হারুন অর রশীদ, সহকারী পরিচালক সাইফুল ইসলাম এবং সহকারী পরিচালক ইতি দত্ত সেন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখার উপসচিব রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাদের জনস্বার্থে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়। আদেশ অনুযায়ী হারুন অর রশীদকে জয়পুরহাট, সাইফুল ইসলামকে পাবনা এবং ইতি দত্ত সেনকে গোপালগঞ্জে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে।
জানা গেছে, ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পের আওতায় যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে দরিদ্র জরিপের ভিত্তিতে ২ হাজার ৪২ জন নারীকে তালিকাভুক্ত করা হয়। গত ১৬ মে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সারাদেশের সঙ্গে একযোগে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধনের পর ১ হাজার ৯৮০ জন উপকারভোগী নারীর মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা পাঠানো হয়। তবে অভিযোগ ওঠার পর ৬২ জনের অর্থ সহায়তা স্থগিত করে মন্ত্রণালয়।
প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, যেসব পরিবারের নিজস্ব জমি বা বাড়ি নেই, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা অথবা প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছে—এমন পরিবারের নারী প্রধানরা ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু বাস্তবে এসব শর্ত পূরণ না করেও কিছু সচ্ছল পরিবারের নারী তালিকাভুক্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠে।
এ বিষয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ হওয়া উপপরিচালক হারুন অর রশীদ বলেন, “২০৪২ জনের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল। স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করার চেষ্টা করা হয়েছে। পরে ৬২ জনের বিষয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি জানার পর আমি নিজেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে তাদের কার্ড স্থগিতের সুপারিশ করি। তবে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাকে অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে।”
অন্যদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সুপারিশ ও প্রভাবের কারণেই প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা তালিকায় স্থান পেয়েছেন। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যশোর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আশিকুজ্জামান তুহিন বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের পাইলট প্রকল্পটি জেলা সমাজসেবা কার্যালয় তদারকি করেছে। জেলা কার্যালয় থেকেই মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠানো হয়েছে। ৬২ জনের কার্ড স্থগিত হওয়ার বিষয়টি আমরা জেনেছি। এ বিষয়ে উপজেলা কার্যালয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
এদিকে প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় উপকারভোগীদের তালিকা পুনঃযাচাই এবং ভবিষ্যতে আরও কঠোর বাছাই প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, প্রকৃত দরিদ্র ও অসহায় নারীরা যাতে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্তব্য করুন