পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় হাতুড়ে কবিরাজের ভুল চিকিৎসায় মোছাঃ রুবাইদা (৪) নামে এক শিশুকন্যার ডান হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে শিশুটির হাত কেটে ফেলতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকরা। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (২২ মে) তেঁতুলিয়া উপজেলার ৪ নম্বর শালবাহান ইউনিয়নের গবরাগছ গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মিন্টুর মেয়ে রুবাইদা বাড়ির পাশে একটি ছোট আমগাছে উঠতে গিয়ে নিচে পড়ে যায়। এতে তার ডান হাতের বাহুতে গুরুতর আঘাত লাগে। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে ধারণা করেন শিশুটির হাত ভেঙে গেছে।
পরে স্থানীয় কয়েকজনের পরামর্শে শিশুটিকে শালবাহান বাজারের কথিত কবিরাজ মশির উদ্দিন ওরফে শানুর কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো ধরনের চিকিৎসা জ্ঞান বা প্রশিক্ষণ ছাড়াই ওই কবিরাজ শিশুটির হাতে বাঁশের পাতি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে দেন। এরপর কয়েক দিনের মধ্যেই হাত ফুলে যায় এবং বাহুতে ফোস্কা পড়ে পচন ধরতে শুরু করে।
শিশুটির অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা আবারও কবিরাজের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন তিনি হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে গত রোববার (২৪ মে) দুপুরে রুবাইদাকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শিশুটির হাতের অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাকিল আহম্মদ বলেন, “শিশুটির হাতের অবস্থা খুবই খারাপ। সংক্রমণ অনেক দূর ছড়িয়ে গেছে। এখন হাত রাখা যাবে নাকি কেটে ফেলতে হবে, সে সিদ্ধান্ত মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নেবেন।”
তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের হাতুড়ে চিকিৎসকরা সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
অভিযুক্ত কবিরাজ মশির উদ্দিন শানু অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করলেও দাবি করেন, “অনেক রোগী আমার চিকিৎসায় ভালো হয়েছে। বাচ্চাটার হাতও ভালো হয়ে যাবে।” তবে চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো প্রশিক্ষণ, সনদ বা লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করেন যে তার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই।
তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল আরিফ বলেন, “বর্তমান সময়ে এসেও মানুষ হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে যাচ্ছে, এটি দুঃখজনক। শুরুতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিলে শিশুটিকে সহজেই সুস্থ করা সম্ভব হতো। এখন পরিস্থিতি অনেক জটিল হয়ে গেছে।”
ভুক্তভোগী শিশুর মা নুর জাহান বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা না বুঝে কবিরাজের কাছে নিয়ে ভুল করেছি। এখন ডাক্তার বলছে হাত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। যারা আমার মেয়ের এমন সর্বনাশ করেছে, তাদের বিচার চাই।”
তিনি জানান, পরে পঞ্চগড় সদর হাসপাতাল থেকে রেফার করার পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা জানান শিশুটির হাতে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না পেলে হাতের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এ বিষয়ে পঞ্চগড়ের সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “ঘটনার বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে হাতুড়ে কবিরাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, গ্রামাঞ্চলে এখনও অবৈধ ও অদক্ষ হাতুড়ে চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রশাসনের নজরদারি ও কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত এমন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
মন্তব্য করুন