মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় মৃত এক চা শ্রমিকের প্রভিডেন্ট ফান্ডের (পিএফ) টাকা আত্মসাতের অভিযোগে বিক্ষোভ করেছেন বিজয়া চা বাগানের শ্রমিকেরা। প্রতিকারের দাবিতে গত মঙ্গলবার ও বুধবার দুই দফায় বাগান ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন তারা। পরে বাগান ব্যবস্থাপকের আশ্বাসে শ্রমিকেরা কাজে ফিরে যান।
জানা যায়, কুলাউড়া উপজেলার জয়চণ্ডী ইউনিয়নে ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) পরিচালিত বিজয়া চা বাগানের নিয়মিত শ্রমিক ছিলেন জারিয়া খাড়িয়া। বার্ধক্যজনিত ও বিভিন্ন অসুস্থতায় ২০২২ সালে তিনি মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী ও সন্তান পিএফের টাকা পাওয়ার জন্য আবেদন করেন।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের শেষ দিকে জারিয়া খাড়িয়ার পিএফের ২ লাখ ২৪ হাজার ৩৬০ টাকা বিজয়া চা বাগানের অ্যাকাউন্টে জমা করে ন্যাশনাল টি কোম্পানি।
সে সময় বিজয়া চা বাগানে কেরানি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন কিশোল চন্দ্র দাস (ছনা বাবু)। তিনি বর্তমানে এনটিসির অধীন মাধবপুর উপজেলার পারকুল চা বাগানে কেরানি হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
জারিয়ার পরিবারের অভিযোগ, পিএফের টাকা বাগানের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর কিশোল চন্দ্র দাস টাকা উত্তোলন করলেও তা পরিবারকে দেওয়া হয়নি। বরং পরিবারকে টাকা এখনো আসেনি বলে জানিয়ে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে ২০২৬ সালের শুরুর দিকে তিনি বিজয়া চা বাগান থেকে পারকুল চা বাগানে বদলি হয়ে যান।
বিষয়টি পরে বাগানের শ্রমিক কানু লায়েক, রফিক মিয়া ও লছমন পাসিকে জানান জারিয়ার স্ত্রী ও সন্তান। শ্রমিকেরা বিষয়টি বাগান ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবীরকে জানালে পিএফের টাকা উত্তোলনের বিষয়টি সামনে আসে।
কানু লায়েক, রফিক মিয়া, লছমন পাসিসহ কয়েকজন শ্রমিকের অভিযোগ, জারিয়া খাড়িয়ার পিএফের টাকা ২০২৩ সালে বাগানের অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ার পর সাবেক কেরানি কিশোল চন্দ্র দাস, ক্লার্ক শিপ্রা বুনার্জী ও বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি কিরণ শুক্ল বৈদ্য মিলে তা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন।
শ্রমিকেরা জানান, এ ঘটনায় তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি কিরণ শুক্ল বৈদ্যকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে লছমন পাসিকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি গঠন করেছেন। একই সঙ্গে সাবেক কেরানি কিশোল চন্দ্র দাস ও ক্লার্ক শিপ্রা বুনার্জীর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছেন।
বাগান ব্যবস্থাপকের আশ্বাসে শ্রমিকেরা আপাতত আন্দোলন স্থগিত করেছেন। তবে দ্রুত যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
অভিযোগ অস্বীকার করে পঞ্চায়েত কমিটির সাবেক সভাপতি কিরণ শুক্ল বৈদ্য বলেন, জারিয়া খাড়িয়ার পিএফের টাকার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। কেউ তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে পারলে যেকোনো শাস্তি মেনে নেবেন।
সাবেক কেরানি কিশোল চন্দ্র দাস (ছনা বাবু) বলেন, “জারিয়া খাড়িয়ার পিএফের কোনো টাকা আমি নিইনি। টাকাগুলো বাগানের কাজেই ব্যয় করা হয়েছে। আগামী রোববার তাদের টাকা দেওয়া হবে।”
একজন শ্রমিকের পিএফের টাকা বাগানের কাজে ব্যয় করার নিয়ম আছে কি না এবং বিষয়টি এতদিন কেন পরিবারকে জানানো হয়নি—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোনকলটি কেটে দেন।
বিজয়া চা বাগানের ব্যবস্থাপক হুমায়ুন কবীর বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিন পরই কিশোল চন্দ্র দাস বদলি হয়ে যান। শ্রমিকদের কাছ থেকে বিষয়টি জানার পর তিনি পুরোনো ফাইলপত্র যাচাই করে দেখতে পান, জারিয়া খাড়িয়ার পিএফের টাকা প্রায় দুই বছর আগে উত্তোলন করা হয়েছে। সাবেক কেরানি ছনা বাবুও বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানান তিনি।
হুমায়ুন কবীর বলেন, “জারিয়া সময়মতো তাঁর টাকা পাননি—এটি সত্যিই দুঃখজনক। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হচ্ছে।”
জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন বাগান ব্যবস্থাপক।
মন্তব্য করুন