বিয়ের প্রস্তাব এলে একটি মুসলিম পরিবারের সামনে নানা প্রশ্ন আসে—ছেলেটি কী করেন, আয়-রোজগার কেমন, বাড়ি-গাড়ি আছে কি না, পরিবারের সামাজিক অবস্থান কেমন। এসব বিষয় একেবারে অগ্রহণযোগ্য নয়। বরং সংসার পরিচালনার সামর্থ্য ও দায়িত্ববোধও বিবাহের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইসলামী শিক্ষায় পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে একজন পুরুষের দীনদারি ও চরিত্রকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তির দীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হওয়া গেলে তার সঙ্গে বিয়ের বিষয়ে বিবেচনা করা উচিত; অন্যথায় সমাজে ফেতনা ও বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে হাসান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
আলেমদের ব্যাখ্যায়, এখানে দীনদারি বলতে শুধু বাহ্যিক কিছু ধর্মীয় চর্চাকে বোঝানো হয়নি। বরং আল্লাহভীতি, সৎকর্ম, দায়িত্বশীলতা ও মানুষের সঙ্গে উত্তম আচরণ—সব মিলিয়ে একজন মানুষের সামগ্রিক ধর্মীয় চরিত্রকে বোঝানো হয়েছে।
দীনদারির বিষয়টি আমাদের সমাজে অনেক সময় সংকীর্ণ অর্থে দেখা হয়। নামাজ পড়া, দাড়ি রাখা কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলাকেই অনেকে দীনদারির প্রধান প্রমাণ মনে করেন।
কিন্তু একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তার আচরণে। সে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করে, বাবা-মায়ের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল, দুর্বল মানুষের সঙ্গে তার আচরণ কেমন এবং রাগের সময় নিজেকে কতটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে—এসবও তার চরিত্র ও দীনদারির গুরুত্বপূর্ণ দিক।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের মধ্যে উত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। তাই বিয়ের জন্য পাত্র বাছাইয়ের সময় তার ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি পারিবারিক আচরণ ও চরিত্র সম্পর্কে খোঁজ নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্যই বিবেচ্য। ইসলামে স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে। তাই একজন সম্ভাব্য পাত্রের উপার্জনের সক্ষমতা, দায়িত্ববোধ ও হালাল-হারামের বিষয়ে সচেতনতা বিবেচনা করা স্বাভাবিক।
তবে শুধু সম্পদশালী হওয়াই একজন মানুষকে ভালো স্বামী হওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না। অর্থ-সম্পদ পরিবর্তনশীল; আজ যে ব্যক্তি সচ্ছল, ভবিষ্যতে তার আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে।
অন্যদিকে দীনদারি, সততা, দায়িত্ববোধ ও উত্তম চরিত্র একজন মানুষের জীবনের নানা পরিস্থিতিতে তার আচরণকে প্রভাবিত করে।
ফিকহের আলোচনায় ‘কাফা’আহ’ বা বৈবাহিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি এসেছে। বিভিন্ন মাজহাবে এর কিছু মানদণ্ড নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও শুধু সম্পদ বা সামাজিক মর্যাদাকে একজন পাত্রের চূড়ান্ত যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়নি।
বংশমর্যাদা নিয়েও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট। পবিত্র কোরআনের সূরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন, মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাবান সে-ই, যে সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।
অর্থাৎ সামাজিক পরিচয়, বংশ কিংবা পারিবারিক মর্যাদা একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের একমাত্র মানদণ্ড নয়।
বিয়ের ক্ষেত্রেও এই শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ছেলে উচ্চবংশীয় বা প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তান হলেই তিনি ভালো স্বামী হবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। তার নিজের চরিত্র, তাকওয়া ও দায়িত্বশীলতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পাত্রের চরিত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে তার রাগের স্বভাবকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে একজন মানুষ খুবই ভদ্র হতে পারেন; কিন্তু রাগের সময় তার প্রকৃত আচরণের অনেকটাই প্রকাশ পেতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এক সাহাবিকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘রাগ করো না।’ সহিহ বুখারিতে বর্ণিত এই শিক্ষা মানুষের আত্মসংযমের গুরুত্ব তুলে ধরে।
তাই পাত্রের রাগের ধরন, মতের অমিল হলে তার আচরণ, অন্যকে অপমান করার প্রবণতা আছে কি না এবং বিরোধের সময় সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না—এসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
যে ব্যক্তির মধ্যে হুমকি, অপমান, আগ্রাসী আচরণ বা সহিংসতার প্রবণতা রয়েছে, তাকে শুধু আর্থিক সক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থানের কারণে উপযুক্ত পাত্র হিসেবে বিবেচনা করা ঝুঁকিপূর্ণ।
ইসলামে মেয়ের সম্মতির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সহিহ হাদিসে নারীর সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য নয় বলে নির্দেশনা পাওয়া যায়।
পূর্বে বিবাহিত নারীর নিজের বিষয়ে তার অভিভাবকের তুলনায় অধিক অধিকার রয়েছে—এমন বর্ণনা সহিহ মুসলিমে এসেছে। একইভাবে কুমারী নারীর কাছ থেকেও তার সম্মতি নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অতএব, অভিভাবকের দায়িত্ব উপযুক্ত পাত্র খুঁজে বের করা হলেও মেয়ের মতামত ও সম্মতিকে উপেক্ষা করা ইসলামী শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিয়ে একজন নারীর পুরো জীবনের সঙ্গে জড়িত সিদ্ধান্ত; তাই তার পছন্দ, আপত্তি ও মানসিক প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
পাত্রের ক্ষেত্রে শুধু তার আয়, বাড়ি-গাড়ি কিংবা পারিবারিক পরিচয় নয়—আরও কিছু বিষয় খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
তিনি কি সত্যবাদী? তার উপার্জন কি হালাল? তিনি কি দায়িত্বশীল? রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন? নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার আচরণ কেমন? সংকটের সময় দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা আছে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তরও পাত্র নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ।
একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্র বোঝার জন্য শুধু তার নিজের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে তার বন্ধু, সহকর্মী, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের কাছ থেকেও খোঁজ নেওয়া যেতে পারে।
ইসলামের শিক্ষা শুধু ‘ধনী ছেলে খোঁজো’—এমন নয়। আবার শুধু বড় বংশের ছেলে কিংবা বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় দেখেও পাত্র নির্বাচন করতে বলা হয়নি।
বরং একজন মানুষের দীন, চরিত্র, দায়িত্ববোধ, সততা ও পারিবারিক আচরণকে গুরুত্ব দেওয়ার শিক্ষা রয়েছে।
একজন মেয়ের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি শুধু বড় বাড়ি বা আর্থিক স্বচ্ছলতা নয়। এমন একজন জীবনসঙ্গী, যার কাছে তার সম্মান, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ—সেই গুণগুলোই দীর্ঘমেয়াদি দাম্পত্য জীবনে সবচেয়ে বেশি মূল্য বহন করে।
মন্তব্য করুন