মাদারীপুরের ধজী গ্রামের মাটিতে গড়ে ওঠা ধজী হামিদিয়া ফাযিল মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি দীর্ঘ ধর্মীয় ও মানবিক ঐতিহ্যের নাম। আর সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে একজন নিবেদিতপ্রাণ আলেম, শিক্ষক ও সমাজহিতৈষী—মরহুম আলহাজ্ব মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.)-এর নাম। তাঁর জীবন যেন একটি প্রদীপের মতো—নিজে জ্বলে অন্যের পথ আলোকিত করার এক দীর্ঘ সাধনা।
১৯৪১ সালে মাদারীপুরের ধজী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.)। তাঁর পিতা মরহুম হাফেজ হামিদ উদ্দিন (রহ.) ছিলেন দ্বীনের প্রতি অনুরাগী ও সমাজসেবী মানুষ। শৈশবেই পিতাকে হারিয়ে জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে। কিন্তু প্রতিকূলতা তাঁর শিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। জ্ঞানার্জনের প্রতি গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
তিনি দিকরচর ফাযিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল, মাদারীপুর আহমদিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম ও ফাযিল এবং পরবর্তীতে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ মাজিদিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবনে বহু খ্যাতিমান আলেমের সান্নিধ্য লাভের সুযোগ ঘটে। তাঁদের জ্ঞান, আদর্শ ও আধ্যাত্মিক প্রেরণা তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
পারিবারিক স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, কর্মজীবনের এক পর্যায়ে খানজাপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় এক রাতে তিনি স্বপ্নে পিতাকে দেখতে পান। সেই স্বপ্নে তাঁকে পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণের ইঙ্গিত দেওয়া হয়। পরবর্তীতে কামিল শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি নিজের জীবনকে ধজী হামিদিয়া মাদ্রাসার সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে সম্পৃক্ত করেন।
১৯৬১ সালে মাদ্রাসার দায়িত্ব গ্রহণের পর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের অধ্যায়। অর্থের সংকট, শিক্ষকস্বল্পতা ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা—সবকিছুকে সামনে নিয়েই তিনি প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখেন। স্থানীয় স্মৃতিচারণে জানা যায়, মাদ্রাসার উন্নয়নের জন্য তিনি বহু মানুষের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন, বিভিন্ন পীর-মাশায়েখ ও আলেমের দ্বারস্থ হয়েছেন এবং নিজের সাধ্য অনুযায়ী নিরলস চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তাঁর সেই একাগ্রতা ধীরে ধীরে একটি ছোট শিক্ষাকেন্দ্রকে বৃহত্তর দ্বীনি শিক্ষাঙ্গনে রূপ দেওয়ার পথ তৈরি করে।
মাদ্রাসার নামকরণ, প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তার এবং পরবর্তীতে দাখিল, আলিম ও ফাযিল পর্যায়ের অনুমোদন লাভ—প্রতিটি ধাপেই তাঁর শ্রম ও নেতৃত্বের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে। ১৯৬২ সালে দাখিল পর্যায়ে অগ্রগতি, ১৯৬৯ সালে আলিম এবং ১৯৭৫ সালে ফাযিল অনুমোদনের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আরও সুদৃঢ় ভিত্তি লাভ করে।
তাঁর জীবনে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিলেন মুজাহিদে আজম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)। প্রাপ্ত স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তাঁর সান্নিধ্যে এসে মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.) দ্বীনি শিক্ষার বিস্তার ও মাদ্রাসা সেবাকে নিজের জীবনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। ফরিদপুরীর একটি উপদেশ—“কিতাব মুতাআলা করে পড়াবেন”—তিনি জীবনের আদর্শে পরিণত করেছিলেন। ফলে পাঠদানের আগে বিষয়টি গভীরভাবে অধ্যয়ন করে সহজ ভাষায় শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপন করা ছিল তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য।
শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না; ছিলেন অভিভাবক, পথপ্রদর্শক ও অনুপ্রেরণার মানুষ। তাঁর কাছে পড়া বহু শিক্ষার্থী পরবর্তীতে আলেম, শিক্ষক, অধ্যক্ষ, বিচারক, অধ্যাপক, প্রশাসক ও বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তাঁদের সাফল্যের পেছনে ধজী হামিদিয়া মাদ্রাসার পাশাপাশি মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.)-এর শিক্ষাদর্শ ও ব্যক্তিগত প্রভাবের কথাও স্মরণ করা হয়।
মাদ্রাসার সীমানা পেরিয়েও তাঁর কর্মপরিধি ছিল বিস্তৃত। বিভিন্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নে তিনি সহযোগিতা করেছেন। ধজী দারুসসালাম জামে মসজিদের ইমাম ও পরিচালনার দায়িত্বে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। ওয়াজ-মাহফিল, দ্বীনি দাওয়াত, সামাজিক সালিশ ও জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ডেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নেও তিনি ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যায়।
মানুষের সেবার ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। মাওলানা মোহাম্মাদ আলী ট্রাস্টের উদ্যোগে ২০০৯ সালে ধজী আল-হেলাল ক্লাব কার্যালয়ে বিনামূল্যে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা ও ওষুধ বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়। দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য পরিচালিত এ উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিয়ে গেছে।
তাঁর পারিবারিক জীবনও ছিল বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময়। স্ত্রী মোছাম্মৎ ছেতারা বেগমের সঙ্গে তাঁর সংসারে জন্ম নেন তেরো সন্তান। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। অন্যরা চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যাংকিং, ব্যবসা ও ধর্মীয় শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এ পরিবারও যেন তাঁর শিক্ষা ও মূল্যবোধের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে।
২০০২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, ৬৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.)। পরদিন ধজী হামিদিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং মাদ্রাসার পাশে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে একটি জীবনের অবসান ঘটলেও শেষ হয়নি তাঁর রেখে যাওয়া কর্মের গল্প।
আজ ধজী হামিদিয়া মাদ্রাসার প্রাঙ্গণে দাঁড়ালে তাঁর শ্রম, স্বপ্ন ও ত্যাগের স্মৃতি যেন নীরবে কথা বলে। একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা তাঁর একমাত্র অর্জন ছিল না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে জ্ঞান, নৈতিকতা ও দ্বীনি চেতনায় গড়ে তোলার যে প্রয়াস তিনি চালিয়েছেন, সেটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষের কর্ম থেকে যায় সময়ের বুকের ওপর। মাওলানা মোহাম্মাদ আলী (রহ.) তেমনই একজন। ধজী হামিদিয়া ফাযিল মাদ্রাসার ইতিহাসে তাঁর নাম তাই শুধু একজন প্রতিষ্ঠাতা বা শিক্ষক হিসেবে নয়, বরং এক নিবেদিতপ্রাণ আলেম ও আলোকবর্তিকা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর হাতে জ্বলে ওঠা সেই জ্ঞানের প্রদীপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পথও আলোকিত করুক—এটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে সুন্দর স্মরণ।
লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর।
মন্তব্য করুন