কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে এক ব্যবসায়ীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমে ঘটনাটি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা বলে ধারণা করা হলেও, পরবর্তীতে ঘটনাস্থলের বিভিন্ন আলামত, মাথায় আঘাতের চিহ্ন এবং সঙ্গে থাকা টাকার ব্যাগ নিখোঁজ হওয়ায় পরিকল্পিত হামলা ও ছিনতাইয়ের সন্দেহ জোরালো হয়ে উঠেছে।
নিহত সোহেল রানা (৩৫) ভৈরব উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের পানাউল্লাহচর এলাকার মৃত সিরাজ মিয়ার সর্বকনিষ্ঠ ছেলে। তিনি ভৈরব পৌর শহরের মুসলিমের মোড় এলাকায় “মোহাম্মদ কেমিক্যাল” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার (১৬ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে সোহেল রানা ব্যবসায়িক পাওনা আদায় শেষে বাজিতপুর থেকে মোটরসাইকেলযোগে নিজ বাড়ি ভৈরবে ফিরছিলেন। পথে কুলিয়ারচর পৌরসভার বড়খারচর মহল্লার কাশ্মিরী আইডিয়াল স্কুল সংলগ্ন এলাকায় সড়কের পাশে তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন পথচারীরা। কিছু দূরে পড়ে থাকতে দেখা যায় তার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও।
পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। শুরুতে পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা ছিল, সড়কের ওপর ড্রেজার পাইপ পারাপারের জন্য তৈরি উঁচু আইল্যান্ডসদৃশ বাধায় মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি। সে কারণেই প্রথমদিকে কোনো মামলা বা অভিযোগ ছাড়াই মরদেহ বাড়িতে নিয়ে যায় পরিবার।
পরদিন রোববার (১৭ মে) যোহরের নামাজের পর পানাউল্লাহচর বালুর মাঠে জানাজা শেষে শম্ভুপুর পাক্কার মাথা কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তবে দাফনের পর থেকেই ঘটনার বিভিন্ন দিক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
স্থানীয়দের দাবি, যেখানটিতে উঁচু বাধা রয়েছে, সেখান থেকে নিহত ব্যক্তি ও মোটরসাইকেল অনেক দূরে পড়ে ছিল। এছাড়া মোটরসাইকেলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির চিহ্নও পাওয়া যায়নি। অথচ সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা স্বাভাবিক। এতে স্থানীয়দের সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
এছাড়া নিহতের মাথার পেছনে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, শুধুমাত্র দুর্ঘটনায় পড়ে গেলে এমন আঘাত কীভাবে এলো, অথচ মোটরসাইকেল প্রায় অক্ষত থাকলো?
ঘটনার সবচেয়ে রহস্যজনক দিক হচ্ছে, সোহেল রানার সঙ্গে থাকা টাকার ব্যাগটি নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। পরিবারের দাবি, বিভিন্ন স্থান থেকে তিনি প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার পর তার কাছে থাকা টাকার ব্যাগটি আর পাওয়া যায়নি। পরে ঘটনাস্থলের আশপাশ থেকে ব্যাগের কাটা ফিতার অংশ উদ্ধার হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ধারণা, দুর্বৃত্তরা আগে থেকেই ওৎ পেতে ছিল। সড়কের উঁচু বাধার কারণে মোটরসাইকেলের গতি কমে গেলে তারা পেছন থেকে ভারী কিছু দিয়ে মাথায় আঘাত করে থাকতে পারে। এরপর টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
এদিকে ঘটনাস্থলের আশপাশে পড়ে থাকা একটি কাঁঠাল নিয়েও তৈরি হয়েছে নতুন রহস্য। স্থানীয়দের কেউ কেউ ধারণা করছেন, আঘাত করার কাজে ভারী কোনো বস্তু ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা ঘটনাটিকে নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দিন বলেন, “এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
মন্তব্য করুন