অনলাইন ডেস্কঃ
৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পীয় মোড়কে ‘রেজিম চেঞ্জ’

ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগের সব সীমা ছাড়িয়ে এক নতুন মাত্রার উন্মত্ততা যোগ করেছেন। কোনো প্রত্যক্ষ উসকানি ছাড়াই চালানো এ আগ্রাসন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো ‘রেজিম চেঞ্জ’ নীতিরই ধারাবাহিকতা, তবে ট্রাম্পের নেতৃত্বে তা আরও বেশি বেপরোয়া ও বিপজ্জনক রূপ নিয়েছে।

নতুন বছরের শুরুতেই ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার ওপর ব্যাপক বিমান হামলার নির্দেশ দেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, হামলার সময় ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়েছে এবং তাকে একটি গোপন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, যার অবস্থান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। যদিও এ ঘটনা আকস্মিক মনে হলেও ট্রাম্পের অতীত কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিলে এটিকে পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত বলা যায় না। আন্তর্জাতিক আইন, কূটনৈতিক শিষ্টাচার কিংবা মানবাধিকারের প্রশ্নে ট্রাম্পের অবজ্ঞা নতুন নয়।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একসময় বিদেশে যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে ট্রাম্প প্রশাসন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে এই আগ্রাসন কেবল সামরিক হামলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলীয় অঞ্চলে তথাকথিত ‘মাদক পাচার দমন’-এর অজুহাতে নৌকা ও জাহাজে বোমা হামলা চালিয়ে আসছে। এসব অভিযানে বহু বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে যুদ্ধাপরাধের প্রশ্ন তুলেছে।

আরো পড়ুন...  মাইজদীতে মোটরসাইকেল-পিকআপ সংঘর্ষে প্রাণ গেল দুই তরুণের

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার একাধিক তেলবাহী ট্যাংকার জোরপূর্বক দখল করেছে। ট্রাম্প প্রশাসন এমনকি দাবি করেছে, ভেনেজুয়েলা যুক্তরাষ্ট্রের তেল, ভূমি ও সম্পদ চুরি করছে—যা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও ব্যাপকভাবে সমালোচিত। এসব অভিযোগকে সামনে রেখেই ভেনেজুয়েলার ওপর রাজনৈতিক ও সামরিক চাপ আরও বাড়ানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এ আগ্রাসনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে চলমান মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নীতি। এসব নিষেধাজ্ঞায় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালে জাতিসংঘের সাবেক বিশেষ প্রতিবেদক আলফ্রেড ডি জায়াস জানান, যুক্তরাষ্ট্রের জোরপূর্বক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে ইতোমধ্যে প্রায় এক লাখ ভেনেজুয়েলান প্রাণ হারিয়েছেন। অর্থাৎ সামরিক হামলার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অবরোধও দেশটির জনগণের জন্য ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের সিনেটর মাইক লি দাবি করেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তাকে জানিয়েছেন যে নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাকে যুক্তরাষ্ট্রে এনে ফৌজদারি মামলায় বিচার করা হবে। রুবিওর দাবি অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় চালানো বিমান হামলাগুলো ছিল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকরের সময় মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ‘প্রয়োজনীয়’ পদক্ষেপ।

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরার এই বর্ণনায় গুরুতর অসংগতি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেই বহু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন ও আগ্রাসনের অভিযোগে অভিযুক্ত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজায় দীর্ঘদিন ধরে গণহত্যার অভিযোগ থাকলেও ওয়াশিংটন কখনোই তার বিরুদ্ধে এমন কোনো অবস্থান নেয়নি। এতে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিচারিতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

আরো পড়ুন...  মোরেলগঞ্জে বিবাদমান জমিতে তোলা ঘর ভেঙ্গে ফেলার ঘটনায় লুট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ

ভেনেজুয়েলা দীর্ঘদিন ধরেই তেলসমৃদ্ধ দেশ হিসেবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের লক্ষ্যবস্তু। হুগো শ্যাভেজের সময় থেকেই এই বিরোধের সূচনা, যখন ভেনেজুয়েলা বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, দরিদ্রবান্ধব রাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার মতো নীতিতে অগ্রসর হয়েছিল। বর্তমানে ‘নার্কো-সন্ত্রাসবাদের’ মতো অভিযোগ সামনে এনে সেই পুরোনো শাসন পরিবর্তনের কৌশলই আবার বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, পানামার সাবেক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগা কিংবা ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের কৌশল অনুসরণ করেছিল। এসব হস্তক্ষেপ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে স্থিতিশীলতা নয়, বরং দীর্ঘস্থায়ী অরাজকতা ও মানবিক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। যতদিন যুক্তরাষ্ট্র তার আগ্রাসী নীতির জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জবাবদিহির মুখোমুখি না হবে, ততদিন এ ধরনের রক্তক্ষয়ী হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।

সূত্র: আলজাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধের ভাষান্তর ও সম্পাদনা

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ঈদ বার্তায় ঐক্য ও উন্নয়নের ডাক দিলেন কাউন্সিলর প্রার্থী কেয়া

তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রীকে মুখ বেঁধে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ

কক্সবাজার আয়কর অফিসের সাবেক প্রধান সহকারী মো. ছাবের আহমদের দাফন সম্পন্ন

ইটভাটার পাশে ফসলের ক্ষতিপূরণে নজির! চৌডালায় অর্ধশতাধিক কৃষক পেলেন নগদ অর্থ

শহীদ জিয়ার ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকী ঘিরে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বিএনপির মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত

চাঁপাইনবাবগঞ্জে চুরি হওয়া মোটরসাইকেলসহ যুবক গ্রেপ্তার, দ্রুত উদ্ধার পুলিশের

ভাণ্ডারিয়ায় নুরুল ইসলাম মঞ্জুরের ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত

রামপালে মাদক ও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিসহ ৮ জন গ্রেফতার, ৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার

গণভোট–জুলাই সনদ নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগে চাঁপাইনবাবগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক দলের বিক্ষোভ

ঈদে পর্যটন খাতে হতাশা! শ্রীমঙ্গল–কমলগঞ্জে বুকিং কমে অর্ধেকেরও নিচে

১০

মাগুরায় ট্রাক ড্রাইভার হত্যার রহস্য উদঘাটন, একজন গ্রেপ্তার: পুলিশ সুপার

১১

নরসিংদীতে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা, এলাকায় চাঞ্চল্য

১২

দেবীগঞ্জে হিন্দু পরিবারকে মিথ্যা মামলায় হয়রানির অভিযোগ

১৩

শ্রীমঙ্গলে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে শ্রমিকের মৃত্যু, লেবু বাগানের তারে বিদ্যুৎ সংযোগের অভিযোগ

১৪

ঈদুল আজহায় ৭ দিন বন্ধ থাকবে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি

১৫

নড়াইলে এনসিপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন, আহ্বায়ক জাহিদুল-সদস্য সচিব রিমি

১৬

ঈদকে সামনে রেখে পশুর হাটে চাঁদাবাজি রোধে কঠোর নজরদারির আহ্বান

১৭

চন্দ্রায় ঈদযাত্রার চাপ, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ

১৮

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রত্যয়ে কুয়াকাটা রিপোর্টার্স ইউনিটির যাত্রা শুরু

১৯

মঠবাড়িয়ায় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রোকনুজ্জামানের ফেসবুক আইডি হ্যাক

২০