মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের ইতিহাসে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর নাম। তিনি ছিলেন আদমপুর ইউনিয়নের প্রথম নির্বাচিত চেয়ারম্যান, একজন বীর সেনা কর্মকর্তা, সমাজসংস্কারক ও নির্লোভ জননেতা। তাঁর জীবন ছিল দেশপ্রেম, সততা, মানবসেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯১৪ সালের ১৪ জুন আসামের কাছাড় জেলার শান্তি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মণিপুরী মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও নেতৃত্বগুণে অনন্য। কর্মজীবনের শুরুতে পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও পরবর্তীতে তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সাহসিকতা ও অসামান্য দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ অর্জন করেন মর্যাদাপূর্ণ কিংস কমিশন।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং দীর্ঘদিন সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে ১৯৫৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর তাঁর সামনে খুলে যায় ক্ষমতা ও বিলাসবহুল জীবনের নানা সুযোগ। পাকিস্তান সরকার তাঁকে ঢাকার বিজয় সরণিতে এক বিঘা জমি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমি গ্রামের মানুষ, গ্রামেই থাকতে চাই।
শুধু তাই নয়, পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক আইয়ুব খান তাঁকে কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা ও পদ-পদবির প্রতি কোনো মোহ না রেখে তিনি মানুষের সেবাকেই জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত জনসেবা মানুষের কাছাকাছি থেকেই করা সম্ভব।
পরবর্তীতে তিনি আদমপুরের পূর্ব কোনাগাঁও গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি আনারস বাগান গড়ে তোলেন এবং এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৬০ সালের ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে তিনি আদমপুর ইউনিয়নের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরে ১৯৭৩ সালেও পুনরায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে এলাকার শিক্ষা, যোগাযোগ, কৃষি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে আদমপুর ইউনিয়নে উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। রাস্তা নির্মাণ, মসজিদ প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা বিস্তার ও কৃষি উন্নয়নে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়। তেতইগাঁও পাবলিক হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন ছিল তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তিনি মাটির ঘরে বসবাস করতেন, বাইসাইকেলে চড়ে মানুষের খোঁজখবর নিতেন এবং নিজ হাতে উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিতেন। একজন সৎ, সাহসী ও জনদরদী নেতা হিসেবে আজও আদমপুরবাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন তিনি।
ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরী শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি আদমপুরের ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক অনুকরণীয় অনুপ্রেরণা।
ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম চৌধুরীর গৌরবময় জীবন, সংগ্রাম ও সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তাঁর জীবনী সংগ্রহ ও গ্রন্থ আকারে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন আদমপুরের সাংবাদিক শাব্বির এলাহী। এ উদ্যোগে সহযোগিতা করছেন রফিকুল ইসলাম জসিম।
উদ্যোক্তারা জানান, প্রকাশিতব্য জীবনীগ্রন্থে ক্যাপ্টেন ইব্রাহিমের জীবনের অজানা অধ্যায়, ত্যাগ, সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও সমাজ উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরা হবে। এজন্য তাঁরা সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও দোয়া কামনা করেছেন।
মন্তব্য করুন