মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা-বাগানের ছোট্ট একটি ঘর থেকে শুরু হয়েছিল কুসুম মুন্ডার স্বপ্নযাত্রা। দারিদ্র্য, অভাব-অনটন, অসুস্থতা আর সীমাহীন সংগ্রামের মধ্য দিয়েও থেমে যাননি তিনি। প্রতিদিনের কঠিন বাস্তবতাকে জয় করে আজ তিনি পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে (এইউডব্লিউ)।
সম্প্রতি প্রথম আলো ট্রাস্টের নিয়মিত আয়োজন ‘অদ্বিতীয়ার গল্প’-এ নিজের জীবনের সংগ্রাম, শিক্ষা ও স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন কুসুম মুন্ডা। অনলাইনভিত্তিক এই অনুষ্ঠান প্রথম আলো ও প্রথম আলো ট্রাস্টের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে সম্প্রচার করা হয়। সেখানে তাঁর জীবনের গল্প শুনে আবেগাপ্লুত হন অনেকেই।
কুসুম জানান, ছোটবেলা থেকেই দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বড় হয়েছেন তিনি। তাঁর বাবা-মা দু’জনেই চা-বাগানের শ্রমিক। প্রতিদিনের সীমিত আয়ে সংসার চালানোই ছিল কষ্টকর। সেই সংসারে সন্তানের পড়াশোনার খরচ বহন করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তবুও মেয়ের শিক্ষার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তাঁর বাবা-মা।
বাগানের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কুসুমের শিক্ষাজীবনের শুরু। পরে দূরের স্কুলে প্রতিদিন হেঁটে যেতেন তিনি। টিফিনের জন্য বাবা-মা যে ১০ টাকা দিতেন, সেটিও খরচ না করে জমিয়ে রাখতেন খাতা-কলম কেনার জন্য। প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য না থাকলেও নিজের চেষ্টায় ও আত্মবিশ্বাসে এগিয়ে যেতে থাকেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন কুসুম। সেই স্বপ্ন নিয়েই বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু অর্থাভাবে প্রয়োজনীয় গাইডলাইন, কোচিং কিংবা বাড়তি সহায়তা পাননি। তবুও হার মানেননি। হারিকেনের ক্ষীণ আলোয় রাত জেগে চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।
তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় আসে এসএসসি পরীক্ষার আগে। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও শারীরিক অসুস্থতায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘ দুই বছর শয্যাশায়ী থাকতে হয়। পরিবারের শেষ সম্বল বিক্রি করেও চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়েছে তাঁর বাবা-মাকে। কিন্তু অসুস্থতাও থামাতে পারেনি তাঁর শিক্ষার পথচলা।
কুসুম বলেন, “অসুস্থ অবস্থায়ও আমি শুয়ে শুয়ে পড়তাম। আমার মা আমাকে পরীক্ষা কেন্দ্রে নিয়ে যেতেন, যেন আমি রাস্তায় পড়ে না যাই।”
পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও আর্থিক সংকটের কারণে সেখানে ভর্তি হতে পারেননি তিনি। পরে পূর্ণ বৃত্তি নিয়ে ভর্তি হন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ ও ইংরেজি ভাষার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটাও ছিল তাঁর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। শুরুতে ক্লাসের লেকচার বুঝতে কষ্ট হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। ক্লাস রেকর্ড করে বারবার শুনতেন এবং নিয়মিত ইংরেজি বলার চর্চা করতেন।
বর্তমানে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন কুসুম মুন্ডা। তাঁর বিশ্বাস, চা-বাগান এলাকার মানুষ এখনো শিক্ষার দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাই শিক্ষক হয়ে নিজের কমিউনিটির শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি।
কুসুম বলেন, “আমি চাই আমাদের বাগানে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক। আমার মতো যারা স্বপ্ন দেখতে ভয় পায়, তারা যেন স্বপ্ন দেখতে সাহস পায়।”
দারিদ্র্য, অসুস্থতা ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করে কুসুম মুন্ডার এই অনন্য পথচলা এখন চা-বাগান এলাকার অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্য অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
মন্তব্য করুন