
ভোলায় পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। জেলার বিভিন্ন নদী, খাল, পুকুর ও ডোবায় গত এক বছরে পানিতে ডুবে ১৬৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পানিতে ডুবে আহত হয়েছে আরও ৫৬৯ জন শিশু। স্বাস্থ্য বিভাগের এ পরিসংখ্যান শিশু নিরাপত্তা ও অভিভাবকদের সচেতনতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সর্বশেষ ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নে বাড়ির আঙিনায় খেলার সময় পাশের একটি ডোবায় পড়ে মৃত্যু হয় দুই বছর বয়সী শিশু রোমানের। নুর ইসলাম কবিরাজের এই একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। শিশুটির মৃত্যুর পর পরিবারের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকার পরিবেশ। রোমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে গত এক বছরে জেলায় পানিতে ডুবে মৃত শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৪ জনে।
ভোলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলার বিভিন্ন জলাশয়ে ডুবে মোট ৫৬৯ জন শিশু আহত হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং বাকিরা চিকিৎসা গ্রহণের মাধ্যমে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোলা সদরে ১৩৫ জন আহত শিশুর মধ্যে ৩৬ জন, দৌলতখানে ১৩ জনের মধ্যে ৮ জন, বোরহানউদ্দিনে ৬১ জনের মধ্যে ৫ জন, লালমোহনে ১৬৭ জনের মধ্যে ২২ জন, চরফ্যাশনে ১৪৭ জনের মধ্যে ৭৪ জন, তজুমদ্দিনে ১৭ জনের মধ্যে ১১ জন এবং মনপুরায় ২৯ জনের মধ্যে ৮ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে চরফ্যাশন উপজেলায়। এক বছরে সেখানে পানিতে ডুবে আহত ১৪৭ শিশুর মধ্যে ৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা জেলার মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেক। সংশ্লিষ্টদের মতে, নদীবেষ্টিত ও বিস্তীর্ণ জলাভূমি অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় চরফ্যাশনে শিশুদের পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এছাড়া দুর্গম চরাঞ্চল থেকে দ্রুত চিকিৎসাসেবা না পাওয়াও মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পানিতে ডুবে মারা যাওয়া অধিকাংশ শিশুর বয়স ৪ থেকে ৭ বছরের মধ্যে। এ বয়সের বেশিরভাগ শিশুই সাঁতার জানে না। ফলে পানিতে পড়ে গেলে তারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। এছাড়া সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি ঘটে। কারণ এ সময়ে অনেক অভিভাবক, বিশেষ করে মায়েরা গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং শিশুদের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি থাকে না।
এক মাস আগে ভোলা সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নে পানিতে ডুবে মারা যায় শিশু মরিয়ম। তার বাবা ফিরোজ মিয়া বলেন, একমাত্র সন্তানকে হারানোর বেদনা কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না। এমন অসংখ্য পরিবার রয়েছে, যারা পানিতে ডুবে সন্তান হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শোক বয়ে বেড়াচ্ছে।
এদিকে শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমাতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের কথাও উঠে এসেছে। তাহসিন নামের এক শিক্ষার্থী ‘চাইল্ড সেফটি ডিভাইস’ নামে একটি বিশেষ ডিভাইস উদ্ভাবন করেছেন। মাত্র দুই গ্রাম ওজনের এই ডিভাইসটি শিশুর গলায় বা হাতে রাখা হলে পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইরেন বাজবে এবং অভিভাবকের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পৌঁছে যাবে। তবে কার্যকর উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ডিভাইসটি এখনো বাজারে আসেনি।
ভোলার সিভিল সার্জন ডা. মনিরুল ইসলাম বলেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। তিনি বাড়ির আশপাশের পুকুর ও জলাশয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী স্থাপন, ঘরের দরজায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং শিশুদের সাঁতার শেখানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রসারের মাধ্যমে পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
মন্তব্য করুন