হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭:২৪ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কখন ফরজ হয় এবং কীভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারিত হলো

নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।

প্রশ্ন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ হযরত নবী করীম (সা.)-এর ওপর কখন ফরজ হয়েছিল?

উত্তর: এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।

১. ‘রদ্দুল মুহতার’ কিতাবে কোনো কোনো আলেমের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত নবী করীম (সা.)-এর হিজরতের প্রায় দেড় বছর আগে, রমজান মাসের ১৭ তারিখ শনিবার রাতে তাঁর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।

২. ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, কোনো কোনো আলেমের মতে, রজব মাসে মেরাজের সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। অধিকাংশ আলেম এ মতের প্রতি বিশ্বাসী।

৩. ‘শামী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, কারও মতে রজব মাসের ২৭ তারিখ মেরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, রবিউল আউয়াল মাসে নামাজ ফরজ হয়েছিল।

প্রশ্ন: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হওয়ার আগে হযরত নবী করীম (সা.) ও সাহাবায়ে কেরাম কি কোনো নামাজ আদায় করতেন?

উত্তর: হ্যাঁ। ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে তাঁরা দুই ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন।

প্রশ্ন: মেরাজের রাতে হযরত নবী করীম (সা.)-এর ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়েছিল। তা কীভাবে পাঁচ ওয়াক্তে পরিণত হলো?

উত্তর: ‘আনিছুল ওয়ায়েজীন’ কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী, মেরাজের রাতে হযরত নবী করীম (সা.) আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় হযরত মুসা (আ.)-এর রূহ মোবারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

হযরত মুসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে কী নিয়ে এসেছেন?”

হযরত নবী করীম (সা.) উত্তর দিলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাকে এবং আমার উম্মতের ওপর দিবারাত্রিতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন।”

এ কথা শুনে হযরত মুসা (আ.) বললেন, “আপনার উম্মত দুর্বল। তারা সংসারের কাজকর্মের পাশাপাশি দিবারাত্রিতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। আপনি আল্লাহ তায়ালার কাছে কিছু কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”

হযরত নবী করীম (সা.) তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফিরে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করে দশ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দিবারাত্রিতে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন।

ফেরার পথে হযরত মুসা (আ.) আবার বললেন, “আপনার উম্মত চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করতে পারবে না। আপনি আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”

আরো পড়ুন...  জগন্নাথপুরে মক্তব শিক্ষার্থীদের ক্বিরাত, গজল ও ইসলামী কুইজ প্রতিযোগিতা

এরপর হযরত নবী করীম (সা.) কয়েকবার আল্লাহ তায়ালার দরবারে যাতায়াত করেন এবং প্রতিবারই কিছু কিছু নামাজ কমানো হয়। একপর্যায়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হয়।

তখনও হযরত মুসা (আ.) বললেন, “আপনার উম্মত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও যথাযথভাবে আদায় করতে পারবে না। আপনি আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”

হযরত নবী করীম (সা.) বললেন, “না, এখন আর আল্লাহ তায়ালার দরবারে এ বিষয়ে পুনরায় আবেদন করতে লজ্জাবোধ করছি।”

এরপর তিনি ফিরে আসছিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আওয়াজ এলো, “হে আমার হাবিব! দোস্তের সাক্ষাৎ লাভ করে দোস্ত হাসিমুখে ফিরে যায়। আপনি কাঁদছেন কেন?”

হযরত নবী করীম (সা.) বললেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন। আমি প্রার্থনা করে মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অনুমতি লাভ করেছি। আমার দুঃখ হচ্ছে, আমার উম্মত পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। এ কারণেই আমি কাঁদছি।”

তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, “না, আপনি কাঁদবেন না। আপনার উম্মত যদি যথাযথ নিয়মে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তাহলে আমি তাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিনিময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব দান করব।”

অতএব, এটি আমাদের জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আমরা মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব লাভ করতে পারি। তাই নামাজ যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয় এবং স্ত্রী-পুরুষ, সন্তানসহ পরিবারের সবাই যেন নামাজ আদায় করে, সে বিষয়ে প্রত্যেকের আন্তরিক চেষ্টা করা উচিত।

প্রশ্ন: হযরত নবী করীম (সা.)-এর পূর্ববর্তী নবীদের ওপরও কি নামাজ ফরজ ছিল?

উত্তর: ‘আনিছুল ওয়ায়েজীন’ কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী কোনো নবীর ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত, কারও ওপর চল্লিশ ওয়াক্ত, কারও ওপর বিশ ওয়াক্ত এবং কারও ওপর দশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ছিল। এমন কোনো নবী ছিলেন না, যাঁর ওপর পঞ্চাশের বেশি বা দশ ওয়াক্তের কম নামাজ ফরজ ছিল।

প্রশ্ন: শুধু বালেগ নারী-পুরুষের ওপর নামাজ ফরজ হলে বালক-বালিকাদের নামাজের আদেশ দেওয়া হয় কেন?

উত্তর: ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, যদিও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের ওপর নামাজ ও রোজা ফরজ নয়, তবুও পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সাত বছর বয়স থেকে তাদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত শিক্ষা দেওয়া।

আরো পড়ুন...  কওমি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সংস্কারের পরামর্শ হাফিজ মাছুমের

হযরত নবী করীম (সা.) বলেছেন, সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাজের জন্য আদেশ করা পিতা-মাতার কর্তব্য। তারা দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরও নামাজ আদায় না করলে শাসন করার কথা বলা হয়েছে। তবে শাসনের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না; লাঠি দিয়ে আঘাত করা বা নির্যাতন করা ইসলামসম্মত নয়।

সন্তানদের নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করতে ভালোবাসা, বোঝানো, উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংযতভাবে শাসন করা উচিত। একইভাবে শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও কোমলতা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শিশুদের ইবাদতের শিক্ষা দিতে হবে।

প্রশ্ন: বালেগ নারী-পুরুষ নামাজ ও রোজা ত্যাগ করলে তাদের ব্যাপারে কী হুকুম?

উত্তর: নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ফরজ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কেউ নামাজকে ফরজ হিসেবে অস্বীকার করলে তা ঈমানের জন্য মারাত্মক বিষয়। আর নামাজ ফরজ বলে স্বীকার করেও অলসতা বা অবহেলায় নামাজ ছেড়ে দেওয়া বড় গুনাহ।

এ কারণে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নামাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, সময়মতো নামাজ আদায় করা এবং পরিবারের সদস্যদেরও নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা। কাউকে সংশোধনের ক্ষেত্রে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, কোমলতা ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কাউকে নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

হযরত নবী করীম (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন সামর্থ্য অনুযায়ী তা প্রতিহত করে। তা সম্ভব না হলে মুখে উপদেশ দেবে। এটিও সম্ভব না হলে অন্তরে তা অপছন্দ করবে।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের গুরুত্ব বোঝার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার এবং পরিবার-পরিজনকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

গ্লোবাল এমআইএল উইকে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় স্থান অর্জন

১

মোরেলগঞ্জে আইডিয়াল জেনারেল হাসপাতালের শুভ উদ্বোধন

২

মোরেলগঞ্জে ‘আইডিয়াল জেনারেল হাসপাতালের উদ্বোধন ৩০ অক্টোবর

৩

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: মোরেলগঞ্জে ডরপের উদ্যোগে নিরাপদ পানি প্রকল্পের উদ্বোধন

৪

মোরেলগঞ্জে পালিত হয়েছে বিশ্ব হাতধোয়া দিবস

৫

যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মোরেলগঞ্জে বর্নাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা

৬

শনাক্ত হয়নি পশুর নদে কয়লাবোঝাই ডুবো জাহাজের অবস্থান

৭

মোংলায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

৮

মোরেলগঞ্জে পাঁচগাঁও বাজারে অগ্নিকাণ্ড: নিঃস্ব ব্যবসায়ীরা

৯

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের অভিযানে হরিণের মাংস উদ্ধার

১০

মোংলা বন্দর পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী

১১

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাকোপে, পরিদর্শন করবেন মোংলা বন্দর

১২

পূজার নিরাপত্তায় উপকূলে তৎপর কোস্ট গার্ড

১৩

মোংলায় প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে বিএনপির বর্ণাঢ্য মিছিল

১৪

ডরপের উদ্যোগে জাতীয় স্যানিটেশন মাস ও বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস ২০২৬ উদযাপন

১৫

রামপালে বন্দোবস্ত জমি দখল নিতে হামলার পর ধর্ষণের হুমকি

১৬

সাইবার বুলিং মামলা থেকে খালাস পেলেন সাংবাদিক রেজা মাসুদ

১৭

মোরেলগঞ্জে রাস্তা ও ফেরিঘাট নির্মাণ কাজের পরিদর্শন করলেন এমপি

১৮

জলবায়ু অভিযোজনের নামে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলা চলবেনা

১৯

বাড়ি ফেরা হলোনা অন্তঃসত্ত্বা কাকলির!

২০