নাহমাদুহু ওয়া নুসাল্লি আলা রাসূলিহিল কারীম। আম্মা বা’দ।
উত্তর: এ বিষয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে।
১. ‘রদ্দুল মুহতার’ কিতাবে কোনো কোনো আলেমের বর্ণনা থেকে জানা যায়, হযরত নবী করীম (সা.)-এর হিজরতের প্রায় দেড় বছর আগে, রমজান মাসের ১৭ তারিখ শনিবার রাতে তাঁর ওপর পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়।
২. ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, কোনো কোনো আলেমের মতে, রজব মাসে মেরাজের সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। অধিকাংশ আলেম এ মতের প্রতি বিশ্বাসী।
৩. ‘শামী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, কারও মতে রজব মাসের ২৭ তারিখ মেরাজের রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়। আবার কেউ কেউ বলেন, রবিউল আউয়াল মাসে নামাজ ফরজ হয়েছিল।
উত্তর: হ্যাঁ। ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, সূর্যোদয়ের আগে ও সূর্যাস্তের আগে তাঁরা দুই ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন।
উত্তর: ‘আনিছুল ওয়ায়েজীন’ কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী, মেরাজের রাতে হযরত নবী করীম (সা.) আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় হযরত মুসা (আ.)-এর রূহ মোবারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
হযরত মুসা (আ.) জিজ্ঞাসা করলেন, “আপনি আল্লাহ তায়ালার দরবার থেকে কী নিয়ে এসেছেন?”
হযরত নবী করীম (সা.) উত্তর দিলেন, “আল্লাহ তায়ালা আমাকে এবং আমার উম্মতের ওপর দিবারাত্রিতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন।”
এ কথা শুনে হযরত মুসা (আ.) বললেন, “আপনার উম্মত দুর্বল। তারা সংসারের কাজকর্মের পাশাপাশি দিবারাত্রিতে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারবে না। আপনি আল্লাহ তায়ালার কাছে কিছু কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”
হযরত নবী করীম (সা.) তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালার দরবারে ফিরে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করে দশ ওয়াক্ত নামাজ কমিয়ে দিবারাত্রিতে চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করলেন।
ফেরার পথে হযরত মুসা (আ.) আবার বললেন, “আপনার উম্মত চল্লিশ ওয়াক্ত নামাজও আদায় করতে পারবে না। আপনি আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”
এরপর হযরত নবী করীম (সা.) কয়েকবার আল্লাহ তায়ালার দরবারে যাতায়াত করেন এবং প্রতিবারই কিছু কিছু নামাজ কমানো হয়। একপর্যায়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নির্ধারিত হয়।
তখনও হযরত মুসা (আ.) বললেন, “আপনার উম্মত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও যথাযথভাবে আদায় করতে পারবে না। আপনি আরও কমিয়ে আনার আবেদন করুন।”
হযরত নবী করীম (সা.) বললেন, “না, এখন আর আল্লাহ তায়ালার দরবারে এ বিষয়ে পুনরায় আবেদন করতে লজ্জাবোধ করছি।”
এরপর তিনি ফিরে আসছিলেন। তখন আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে আওয়াজ এলো, “হে আমার হাবিব! দোস্তের সাক্ষাৎ লাভ করে দোস্ত হাসিমুখে ফিরে যায়। আপনি কাঁদছেন কেন?”
হযরত নবী করীম (সা.) বললেন, “হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছিলেন। আমি প্রার্থনা করে মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের অনুমতি লাভ করেছি। আমার দুঃখ হচ্ছে, আমার উম্মত পঁয়তাল্লিশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। এ কারণেই আমি কাঁদছি।”
তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, “না, আপনি কাঁদবেন না। আপনার উম্মত যদি যথাযথ নিয়মে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, তাহলে আমি তাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বিনিময়ে পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব দান করব।”
অতএব, এটি আমাদের জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ। আমরা মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেও পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাজের সওয়াব লাভ করতে পারি। তাই নামাজ যেন কোনোভাবেই নষ্ট না হয় এবং স্ত্রী-পুরুষ, সন্তানসহ পরিবারের সবাই যেন নামাজ আদায় করে, সে বিষয়ে প্রত্যেকের আন্তরিক চেষ্টা করা উচিত।
উত্তর: ‘আনিছুল ওয়ায়েজীন’ কিতাবের বর্ণনা অনুযায়ী, পূর্ববর্তী কোনো নবীর ওপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত, কারও ওপর চল্লিশ ওয়াক্ত, কারও ওপর বিশ ওয়াক্ত এবং কারও ওপর দশ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ ছিল। এমন কোনো নবী ছিলেন না, যাঁর ওপর পঞ্চাশের বেশি বা দশ ওয়াক্তের কম নামাজ ফরজ ছিল।
উত্তর: ‘হাশিয়ায়ে তাহতাবী’ কিতাবে উল্লেখ আছে, যদিও অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের ওপর নামাজ ও রোজা ফরজ নয়, তবুও পিতা-মাতার দায়িত্ব হলো সাত বছর বয়স থেকে তাদের নামাজ, রোজা ও অন্যান্য ইবাদত শিক্ষা দেওয়া।
হযরত নবী করীম (সা.) বলেছেন, সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে নামাজের জন্য আদেশ করা পিতা-মাতার কর্তব্য। তারা দশ বছর বয়সে পৌঁছানোর পরও নামাজ আদায় না করলে শাসন করার কথা বলা হয়েছে। তবে শাসনের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা যাবে না; লাঠি দিয়ে আঘাত করা বা নির্যাতন করা ইসলামসম্মত নয়।
সন্তানদের নামাজের প্রতি অভ্যস্ত করতে ভালোবাসা, বোঝানো, উৎসাহ দেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংযতভাবে শাসন করা উচিত। একইভাবে শিক্ষক ও অভিভাবকদেরও কোমলতা, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে শিশুদের ইবাদতের শিক্ষা দিতে হবে।
উত্তর: নামাজ ইসলামের অন্যতম প্রধান ফরজ ইবাদত। ইচ্ছাকৃতভাবে নামাজ ত্যাগ করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। কেউ নামাজকে ফরজ হিসেবে অস্বীকার করলে তা ঈমানের জন্য মারাত্মক বিষয়। আর নামাজ ফরজ বলে স্বীকার করেও অলসতা বা অবহেলায় নামাজ ছেড়ে দেওয়া বড় গুনাহ।
এ কারণে প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নামাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করা, সময়মতো নামাজ আদায় করা এবং পরিবারের সদস্যদেরও নামাজের প্রতি উৎসাহিত করা। কাউকে সংশোধনের ক্ষেত্রে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, কোমলতা ও ন্যায়সংগত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা কাউকে নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
হযরত নবী করীম (সা.) বলেছেন, তোমাদের কেউ কোনো অন্যায় কাজ হতে দেখলে সে যেন সামর্থ্য অনুযায়ী তা প্রতিহত করে। তা সম্ভব না হলে মুখে উপদেশ দেবে। এটিও সম্ভব না হলে অন্তরে তা অপছন্দ করবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নামাজের গুরুত্ব বোঝার, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যথাযথভাবে আদায় করার এবং পরিবার-পরিজনকে নামাজের প্রতি উৎসাহিত করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী
বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও কলামিস্ট,
প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম, সিলেট।
সাবেক ইমাম ও খতিব, কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ (রহ.) মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, সিলেট।
সাবেক প্রিন্সিপাল, হযরত শাহজালাল (রহ.) ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা, উপশহর, সিলেট।
সাবেক প্রধান শিক্ষক, হযরত শাহজালাল (রহ.) লতিফিয়া দাখিল মাদ্রাসা, দক্ষিণ সুরমা, সিলেট।
মন্তব্য করুন