মোঃ রোকনুজ্জামান শরীফ
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:২১ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

জিরো টলারেন্সের পরও মাদক কেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে?

মনের মধ্যে বহুদিন ধরে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—মাদকের বিরুদ্ধে যদি রাষ্ট্রের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি থাকে, সারা বছর অভিযান চলে, মাদক উদ্ধার হয়, গ্রেপ্তার হয়, মামলা হয়, বিচার হয়; তাহলে মাদক নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন? প্রশ্নটি কেবল একজন নাগরিকের নয়; এটি আজ অসংখ্য পরিবার, অভিভাবক, শিক্ষক এবং সচেতন মানুষের প্রশ্ন। কারণ মাদক এখন শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়—এটি একটি সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট। মাদকের বিস্তার আমাদের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কোনো কোনো পরিবারে মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে বাবা-মায়ের ঘুম হারাম হচ্ছে, ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, সংসারে অশান্তি তৈরি হচ্ছে। কোথাও চুরি, ছিনতাই, মারামারি, সহিংসতা—এমনকি ভয়াবহ অপরাধও ঘটছে মাদকের পেছনে।

রাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঝুঁকি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন। তাদের যানবাহন, জনবল, সরঞ্জাম, সময় ও অন্যান্য ব্যয়ের পেছনে রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। মাদক উদ্ধার ও অপরাধী গ্রেপ্তারের খবর আমরা প্রায় প্রতিদিনই দেখি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যদি এত অভিযান, এত গ্রেপ্তার ও এত অর্থব্যয়ের পরও মাদকের সরবরাহ বন্ধ না হয়, তাহলে সমস্যার মূল জায়গাটি কোথায়?

আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে, মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুধু রাস্তায় কয়েকজন মাদক বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করার যুদ্ধ নয়। এটি একটি বিশাল সরবরাহব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। গাঁজা, ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক দেশের বাজারে কীভাবে আসে, কারা তা বহন করে, কারা মজুত করে, কারা পাইকারি ব্যবসা পরিচালনা করে এবং শেষ পর্যন্ত কারা খুচরা পর্যায়ে পৌঁছে দেয়—এই পুরো চক্রকে চিহ্নিত না করলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে কোনো কোনো মাদকের উৎপাদন হয়ে থাকলে উৎপাদনস্থল চিহ্নিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আবার সীমান্ত দিয়ে যদি মাদক প্রবেশ করে, তাহলে কোন সীমান্তপথ ব্যবহার হচ্ছে, কীভাবে তা দেশের অভ্যন্তরে ঢুকছে এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত—এসব প্রশ্নের উত্তরও খুঁজে বের করা জরুরি। সীমান্ত একটি বিশাল এলাকা; সেখানে চোরাচালান সম্পূর্ণ বন্ধ করা কঠিন হতে পারে। কিন্তু অসম্ভব নয়। প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য, সীমান্ত নজরদারি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা গেলে মাদকের প্রবাহ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

এখানেই আসে আরেকটি স্পর্শকাতর প্রশ্ন—মাদক যদি সীমান্ত অতিক্রম করে দেশের অভ্যন্তরে পৌঁছে যায়, তাহলে মাঝপথে এতগুলো পর্যায় অতিক্রম করে কীভাবে তা শেষ বাজারে পৌঁছায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে শুধু একজন বাহক বা ছোট বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না। তদন্তকে পৌঁছাতে হবে অর্থের উৎস, সরবরাহের নেটওয়ার্ক, মজুতদার, পরিবহনকারী এবং পৃষ্ঠপোষকদের কাছে। একজন খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করে যদি তার জায়গায় আরেকজন এসে দাঁড়ায়, তাহলে অভিযান হয়তো সংখ্যায় সফল হবে, কিন্তু সমস্যার শিকড় অক্ষতই থেকে যাবে। তবে এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বলা প্রয়োজন—কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত করা উচিত নয়। কারণ মাদক নিয়ন্ত্রণের নামে নিরপরাধ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও আইনের শাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হতে পারে, কিন্তু বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক মামলার অপব্যবহার হলে তা যেমন একজন মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে, তেমনি প্রকৃত অপরাধীরাও আড়ালে থাকার সুযোগ পায়।

আরো পড়ুন...  মা ও শিশুর নিরাপত্তাই প্রথম: কখন সিজারিয়ান ডেলিভারি প্রয়োজন, কখন জরুরি?

মাদক নিয়ন্ত্রণের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো—আমরা অনেক সময় চাহিদার দিকটি ভুলে যাই। মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন, কিন্তু মাদকাসক্ত মানুষটিকেও শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্রটি পাওয়া যায় না। অনেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে রয়েছেন। কেউ অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে অবশ্যই আইনের আওতায় আসবেন; কিন্তু একই সঙ্গে তাকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

একজন তরুণ যখন মাদকে আসক্ত হয়, তখন শুধু তার নিজের জীবনটাই নষ্ট হয় না—তার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে পড়ে। একজন মায়ের বুক খালি হয়ে যায়, একজন বাবার ভবিষ্যৎ নিয়ে করা স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়। ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যে অবিশ্বাস জন্ম নেয়। সংসারে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে। কখনো কখনো একজন মাদকাসক্ত মানুষের আচরণে পুরো পরিবার সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মাদকের ছোবল শুধু কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এর শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী মাদকে জড়িয়ে পড়লে শুধু একটি জীবন নয়, একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং দেশের সম্ভাবনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই মাদকবিরোধী যুদ্ধকে কেবল ‘অভিযান-গ্রেপ্তার-মামলা’—এই তিনটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। প্রয়োজন প্রতিরোধ, অভিযান, চিকিৎসা, পুনর্বাসন, সচেতনতা এবং সামাজিক আন্দোলনের সমন্বিত ব্যবস্থা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকবিরোধী সচেতনতা কার্যক্রম নিয়মিত করতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের পরিবর্তন তার আচরণে দেখা যাচ্ছে—এসব বিষয়ে পরিবারকে সচেতন থাকতে হবে। একই সঙ্গে সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিপথগামী তরুণকে ঘৃণা না করে তাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরও তথ্যনির্ভর ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়া দরকার। বড় চালান, অর্থের লেনদেন, সরবরাহ নেটওয়ার্ক ও চোরাচালানের রুট শনাক্ত করতে আধুনিক গোয়েন্দা ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে। মাদক মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত, নিরপেক্ষ ও প্রমাণনির্ভর করা জরুরি।

আরো পড়ুন...  কাণ্ডের সমাজে দণ্ডের নির্বাসন: ন্যায়বিচারহীনতার অন্ধকারে আমাদের সমাজ

একই সঙ্গে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে জবাবদিহিও থাকতে হবে। কোনো মাদক ব্যবসায়ী যেন প্রভাব, অর্থ বা ক্ষমতার কারণে রক্ষা না পায়; আবার কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন মিথ্যা অভিযোগে হয়রানির শিকার না হন—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ন্যায়বিচার ছাড়া মাদকবিরোধী অভিযান কখনো পূর্ণাঙ্গ সফলতা পেতে পারে না।

মাদক নিয়ন্ত্রণে সরকারের পাশাপাশি সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতা, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, অভিভাবক এবং তরুণ সমাজ—সবাইকে নিয়ে একটি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কারণ মাদকের বিরুদ্ধে শুধু আইন দিয়ে যুদ্ধ জেতা সম্ভব নয়; প্রয়োজন মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তোলা। আমাদের মনে রাখতে হবে, মাদক ব্যবসায়ী শুধু একটি পণ্য বিক্রি করে না—সে একটি পরিবারের শান্তি বিক্রি করে, একটি মায়ের চোখের পানি বিক্রি করে, একটি তরুণের ভবিষ্যৎ বিক্রি করে এবং শেষ পর্যন্ত একটি দেশের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে।

তাই আজ সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো—আমরা কি শুধু মাদক ধরব, নাকি মাদকের শিকড়ও ধরব?

‘জিরো টলারেন্স’ শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা বা প্রশাসনিক নীতি হয়ে থাকলে চলবে না। এর প্রতিফলন দেখতে হবে সীমান্তে, বাজারে, পরিবহনে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, পাড়ায়-মহল্লায় এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে। মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই হতে হবে নিরপেক্ষ, সাহসী, মানবিক ও প্রমাণভিত্তিক। একটি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ কেবল সরকারের একার স্বপ্ন নয়—এটি প্রতিটি পরিবারের স্বপ্ন। প্রতিটি মা চান তাঁর সন্তান সুস্থ থাকুক। প্রতিটি বাবা চান তাঁর সন্তানের হাতে বই থাকুক, মাদক নয়। প্রতিটি শিক্ষক চান তাঁর শিক্ষার্থী স্বপ্ন দেখুক, নেশার অন্ধকারে হারিয়ে না যাক।

তাই আসুন, মাদকের বিরুদ্ধে আমরা শুধু অভিযান নয়—একটি জাতীয় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলি।

কারণ একটি মাদকমুক্ত তরুণ মানে একটি নিরাপদ পরিবার; একটি নিরাপদ পরিবার মানে একটি সুস্থ সমাজ; আর একটি সুস্থ সমাজই পারে একটি শক্তিশালী, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থামানো যাবে না। তবে যুদ্ধের কৌশল নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে—কারণ শুধু মাদক উদ্ধার নয়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে মাদকের উৎস বন্ধ করা, সরবরাহের চক্র ভাঙা এবং মাদকাসক্ত মানুষকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা। তাহলেই ‘জিরো টলারেন্স’ একটি কথার প্রতিশ্রুতি না হয়ে বাস্তবতার রূপ পাবে।

লেখক ~ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

Facebook Comments Box

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা: মোরেলগঞ্জে ডরপের উদ্যোগে নিরাপদ পানি প্রকল্পের উদ্বোধন

১

মোরেলগঞ্জে পালিত হয়েছে বিশ্ব হাতধোয়া দিবস

২

যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মোরেলগঞ্জে বর্নাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভা

৩

শনাক্ত হয়নি পশুর নদে কয়লাবোঝাই ডুবো জাহাজের অবস্থান

৪

মোংলায় বর্ণাঢ্য আয়োজনে যুবদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

৫

মোরেলগঞ্জে পাঁচগাঁও বাজারে অগ্নিকাণ্ড: নিঃস্ব ব্যবসায়ীরা

৬

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের অভিযানে হরিণের মাংস উদ্ধার

৭

মোংলা বন্দর পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী

৮

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দাকোপে, পরিদর্শন করবেন মোংলা বন্দর

৯

পূজার নিরাপত্তায় উপকূলে তৎপর কোস্ট গার্ড

১০

মোংলায় প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে বিএনপির বর্ণাঢ্য মিছিল

১১

ডরপের উদ্যোগে জাতীয় স্যানিটেশন মাস ও বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস ২০২৬ উদযাপন

১২

রামপালে বন্দোবস্ত জমি দখল নিতে হামলার পর ধর্ষণের হুমকি

১৩

সাইবার বুলিং মামলা থেকে খালাস পেলেন সাংবাদিক রেজা মাসুদ

১৪

মোরেলগঞ্জে রাস্তা ও ফেরিঘাট নির্মাণ কাজের পরিদর্শন করলেন এমপি

১৫

জলবায়ু অভিযোজনের নামে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলা চলবেনা

১৬

বাড়ি ফেরা হলোনা অন্তঃসত্ত্বা কাকলির!

১৭

৩ হাজারে রাত্রিযাপনের চুক্তিতে ১ হাজার পরিশোধের জেরে হত্যা, আটক-২

১৮

মোরেলগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু: প্রেস কনফারেন্স অনুষ্ঠিত

১৯

“শিশুবিয়ে আর নয়, কন্যা করবে বিশ্বজয়” মোরেলগঞ্জে জাতীয় কন্যাশিশু দিবস পালিত

২০