
ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। গত বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এটি প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় দেশি-বিদেশি নানা মহলের দৃষ্টি এখন এই নির্বাচনকে ঘিরে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিশ্ব গণমাধ্যমেও গুরুত্ব পাচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচন।
এ প্রেক্ষাপটে এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অতীতের তুলনায় বড় পরিসরে সক্রিয় হচ্ছে বিদেশি পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ২০০৮ সালের পর প্রথমবারের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচনটির স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহকে আরও স্পষ্ট করেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ৩০টি বিদেশি রাষ্ট্র এবং চারটি আন্তর্জাতিক সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এরই মধ্যে ইইউর পক্ষ থেকে ১৭৭ সদস্যের একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
ইইউ পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য ইভার্স ইজাবস আগামী ৮ জানুয়ারি ঢাকায় এসে কার্যক্রম শুরু করবেন। তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধান বিচারপতি, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ভোটের কাছাকাছি সময়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আরও সাতজন সদস্য বাংলাদেশে এসে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন।
ইইউ সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে ৫৬ জন দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষক নির্বাচনী প্রস্তুতি, প্রচারণা, ভোটার তালিকা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করবেন। পরবর্তী ধাপে যোগ দেবেন ৯০ জন স্বল্পমেয়াদি পর্যবেক্ষক। স্থানীয় পর্যবেক্ষকরাও এ মিশনের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। ভোটগ্রহণ শেষে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং পরবর্তীতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে ইইউ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই প্রথম জাতীয় নির্বাচন হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে আস্থা তৈরিতে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে অতীতের নির্বাচনগুলোতে অনিয়মের অভিযোগ থাকায় এবারের নির্বাচনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ করতে পর্যবেক্ষক মিশন একটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কূটনৈতিক বলেন, ইইউ পর্যবেক্ষকরা প্রচারণা থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, যা ভোটারদের আস্থা বাড়াবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাকে আরও ন্যায্য করবে।
ইইউ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না। ইইউ এ বিষয়ে সরাসরি কোনো আপত্তি না জানালেও, নির্বাচনের সার্বিক অংশগ্রহণ ও প্রক্রিয়ার গুণগত মান তাদের প্রতিবেদনে মূল্যায়িত হবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নির্বাচন যদি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, তাহলে ইইউসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্ক নতুন গতি পাবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত ও বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা, দলগুলোর পারস্পরিক অনাস্থা এবং অংশগ্রহণমূলকতা নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে নির্বাচনটি সরকারের জন্য যেমন একটি বড় সুযোগ, তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও। ইইউসহ বিদেশি পর্যবেক্ষকদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনই নির্ধারণ করবে এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রার সূচনা নাকি নতুন চাপের উৎস।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচন শুধু একটি ভোটগ্রহণ নয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পথচলার দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সক্রিয় উপস্থিতি সেই যাত্রাকে স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য করতে সহায়ক হবে—এমনটাই প্রত্যাশা।
মন্তব্য করুন