পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় স্থানীয় এক আলেম ও ব্যবসায়ী ক্বারী আব্দুর রউফ মুন্সিকে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর, অপমান ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনার প্রতিবাদ এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার আমজুয়ানী, কনপাড়াসহ কয়েকটি গ্রামের বাসিন্দাদের উদ্যোগে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্য, স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
ক্বারী আব্দুর রউফ মুন্সি তেঁতুলিয়া উপজেলার দেবনগর ইউনিয়নের আমজুয়ানী এলাকার মৃত তরিম উদ্দিনের ছেলে। তিনি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
মানববন্ধনে আব্দুর রউফ অভিযোগ করেন, এমদাদুল হকসহ কয়েকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না দেওয়ায় তাকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।
তার অভিযোগ, গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাকে রশি দিয়ে বেঁধে মারধর, পুকুরের পানিতে মাথা চেপে ধরে হত্যার চেষ্টা, গলায় ছুরি ঠেকিয়ে হুমকি এবং অপমানজনক ভিডিও ধারণ করা হয়।
ভুক্তভোগীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দিন রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তিনি সাতমোড়া এলাকায় এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার নেন। ব্যবসার ৩ লাখ ৪০ হাজার টাকাসহ মোট ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হলে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া কয়েকজন তার পথরোধ করেন।
এ সময় তাকে মারধর করে শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করা হয় এবং সঙ্গে থাকা ব্যাগ থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে নেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আব্দুর রউফ আরও অভিযোগ করেন, একপর্যায়ে তাকে রাস্তার পাশের একটি পুকুরে ফেলে পানিতে মাথা চেপে ধরে শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টা করা হয়। পরে কয়েকজন তাকে টেনে একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে গরু বাঁধার রশি দিয়ে আমগাছের সঙ্গে বেঁধে রাখেন।
সেখানে গলায় ধারালো ছুরি ঠেকিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। চাঁদা না দিলে তাকে হত্যা করে মরদেহ সীমান্ত এলাকায় ফেলে দেওয়া এবং নারীর সঙ্গে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয় বলে দাবি তার।
এ ছাড়া তার পাগড়ি খুলে ফেলা, দাড়ি টেনে কাদায় মাখিয়ে দেওয়া এবং গলায় জুতার মালা পরিয়ে অপমানের অভিযোগও করেন আব্দুর রউফ। একজন নারীকে রশি দিয়ে বেঁধে তার সঙ্গে ভিডিও ধারণ করা হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
স্থানীয় এক ব্যক্তি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। পরে অসুস্থ অবস্থায় তাকে পঞ্চগড় আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বলে জানান ভুক্তভোগী।
আব্দুর রউফের দাবি, ঘটনার পরও অভিযুক্তদের একজন তার কাছে চাঁদার টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে তাকে জুতার মালা পরানো ও রশি দিয়ে বাঁধা অবস্থার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও সম্মানহানিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ ঘটনায় আব্দুর রউফ বাদী হয়ে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পঞ্চগড় সদর থানায় মামলা করেন। মামলায় এমদাদুল হককে (৩৫) প্রধান আসামি করা হয়েছে। এজাহারে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮৫, ৩৫৫, ৫০৬, ১১৪ ও ৩৪ ধারাসহ সাইবার সুরক্ষা আইনের ২৫(২) ও ২৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অন্য আসামিরা হলেন—সলেমান আলী (২৮), তানভীর মাহামুন শাকিব (২৫), সাইদুল ওরফে কাসিম (৪০), হাচিনুর (২৫), বাছেদুল (২১), হারুন (২৬), মানিক (২৫), আমিরুল (৩০) ও সামিউল (৩০)। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দারা একজন আলেমকে মারধর, বেঁধে রেখে নির্যাতন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মুক্তারুল হক মুকু বলেন, “ঘটনাটিতে আমিও তীব্র প্রতিবাদ জানাই। এভাবে একজন আলেমকে মারধর করে বেঁধে রেখে নির্যাতন করা চরম অমানবিক। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সুবিচার প্রত্যাশা করছি।”
আব্দুর রউফ বলেন, তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা চান। একই সঙ্গে হারানো অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
পঞ্চগড় সদর থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। মামলার অভিযোগগুলো তদন্ত করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মন্তব্য করুন