কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়াকে পুনরায় গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। একই মামলায় চার নারীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এদিকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনকে শোকজ করে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রতিবাদ করায় রেনু মিয়াসহ ওই নারীদের ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনও করেছেন তাঁরা।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে কুলিয়ারচর থানার একটি মামলায় ছয়সূতী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে উপজেলার মাধবদী গ্রামে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ।
পুলিশের ভাষ্য, রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে দুই হাতে হাতকড়া পরানোর পর তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে পুলিশকে ঘেরাও করে ধস্তাধস্তির মাধ্যমে তাঁকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন।
তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার ভাষ্য, রেনু মিয়াকে আটক করে হাতকড়া পরানোর পর ঘটনাস্থলে লোকজন জড়ো হলে তিনি কৌশলে পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যান।
রেনু মিয়া ছয়সূতী ইউনিয়নের মাধবদী এলাকার মৃত ইল্লাল মিয়ার ছেলে। পালিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তারে একাধিক পুলিশ দল অভিযান শুরু করে। প্রায় ১০ ঘণ্টা পর সোমবার রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে মাধবদী এলাকা থেকে তাঁকে হাতকড়াসহ পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শারফিন মিয়া বলেন, রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশ একাধিক কৌশল অবলম্বন করে। শেষ পর্যন্ত ১০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ হেফাজতে রেনু মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, হঠাৎ পুলিশ দেখে তিনি ভয় পেয়ে পালিয়ে যান। গ্রামবাসী তাঁর পক্ষে কথা বলায় তিনি পালানোর সুযোগ পান। তবে হাতকড়া থাকায় গ্রাম ছাড়তে পারেননি। পরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবারের সাত নারী সদস্য ও শিশুদের কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে ফিরে যান বলে দাবি করেন তিনি।
এদিকে রেনু মিয়াকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া, পুলিশের কাজে বাধা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে এসআই শারফিন মিয়া বাদী হয়ে মামলা করেন। ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রথম প্রহরে করা ওই মামলায় রেনু মিয়াকে প্রধান আসামি করে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ১৮৬, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৫৩ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলাটির নম্বর ১০।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে এসআই শারফিন মিয়া, কনস্টেবল বাবলু মিয়া ও কনস্টেবল সোহেল রানা আহত হন। পরে তাঁরা কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।
এ মামলায় রেনু মিয়ার ছেলে মনিরের স্ত্রী ইতি আক্তার (২৩), প্রতিবেশী সাদিয়া আক্তার (২০), রত্না (৩০) ও আকলিমা (২৬)কে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। তাঁদের সঙ্গে দেড় বছরের শিশু আয়াত ও ৯ মাসের শিশু রায়ানকেও কিশোরগঞ্জ জেলা আদালতে নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে একজন নারী অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বলে জানা গেছে।
রেনু মিয়ার মেয়ে বিপাশা আক্তার (২৪), প্রতিবেশী মরিয়ম (৪৫) ও আরিফা আক্তার (৪০) অসুস্থ থাকায় তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এদিকে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার ওসি কাজী আরিফ উদ্দীনকে শোকজ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার রাতে তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়।
ওসি কাজী আরিফ উদ্দীন বলেন, সরকারি আদেশে তাঁকে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েছেন।
ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেনও মঙ্গলবার দুপুরে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
রেনু মিয়াসহ চার নারীকে মামলায় জড়ানো এবং তাঁদের জেলহাজতে পাঠানোর ঘটনায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে মাধবদী গ্রামে সংবাদ সম্মেলন করেন রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।
সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, মাধবদী কর্মকারপাড়ার সজিব রায় (৩৫) নামে এক সিঙ্গাপুরপ্রবাসীর পরিবারের কাছে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তি চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইল করছিলেন। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে রেনু মিয়া ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরোধিতার মুখে পড়েন।
পরিবারের দাবি, চাঁদাবাজির বিষয়টি রেনু মিয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর তাঁর ওপর ক্ষোভ তৈরি হয়। এরপর তাঁকে হয়রানি করতে একটি মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। বিপদে পড়া একটি পরিবারকে সহযোগিতা করতে গিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে এলাকাবাসী রেনু মিয়া ও গ্রেপ্তার চার নারীর বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান।
তবে সংবাদ সম্মেলনে করা এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মন্তব্য করুন